দেশের জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধিও বাড়ছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও প্রতি মাসে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের পরিধি এখনো শহরকেন্দ্রিক। বিভাগের হিসাবে ময়মনসিংহ বিভাগের মানুষ ব্যাংক, বীমা বা যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। একই পরিস্থিতি সিলেট বিভাগেও। এ দুই বিভাগের জনসংখ্যার মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা কম হওয়ায় তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ কম দেখায়, আবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতির কথা চিন্তা করে সেখানে তাদের কার্যক্রম কম চালায়। তবে লন্ডনপ্রবাসীখ্যাত সিলেটের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও বিভাগটির হাওর অঞ্চলের মানুষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ মানুষের বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, ক্ষুদ্রঋণ বা ডাকঘরের যেকোনো একটি জায়গায় হিসাব খোলা হয়েছে। শুমারি হয়েছে গত বছরের জুনে। শুমারির আগের ১২ মাসের যেকোনো এক মাসে কেউ হিসাব খুলে থাকলে তিনি এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
জনশুমারির হিসাবে দেখা যায়, নিজ বিভাগের জনসংখ্যার তুলনায় আর্থিক খাতে সবচেয়ে বেশি হিসাবধারী রয়েছেন ঢাকা বিভাগে ২৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ বিভাগের ৯১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮০ জন মানুষ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের হিসাব খুলে আর্থিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিভাগের হিসাবে সবচেয়ে কম রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এ বিভাগের মাত্র ১৭ দশমিক ২৩ শতাংশ বা ১৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৭৪ জন মানুষ ব্যাংক বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাব খুলেছে।
সিলেট বিভাগও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। এ বিভাগের জনসংখ্যার মাত্র ১৩ লাখ ২২ হাজার ৯৩০ জন বা ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ মানুষের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলা রয়েছে। সিলেটের শহরাঞ্চলের ২৫ দশমিক ২৮ শতাংশ মানুষ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় রয়েছে। তবে গ্রামের মাত্র ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ এই সুবিধা পাচ্ছে।
ময়মনসিংহের মানুষের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিমুখ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ব্যাংকাররা। ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসএমই খাতবিশেষজ্ঞ আরফান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা কম। ফলে তারা ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খুলতেও আগ্রহী নয়। সিলেটে হাওর অঞ্চল বেশি থাকায় ওই এলাকা যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে আছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোও সেখানে শাখা খোলার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী না।
জনশুমারির হিসাব বলছে, দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান তথা ব্যাংক, বীমা, ক্ষুদ্রঋণ ও ডাকঘরে হিসাব রয়েছে ২ কোটি ৯৮ লাখ ৮৯ হাজার ৫৮টি। জনসংখ্যার হিসাবে জনসংখ্যার ২৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ব্যবধান খুব বেশি নয়। এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে পুরুষের হিসাব রয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৪টি আর নারীর হিসাব রয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজার ৪০২টি। আর হিজড়া জনগোষ্ঠী থেকে ব্যাংক হিসাব রয়েছে ১ হাজার ৩১৮ জনের। বিবিএসের করা ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। মূলত বিবিএস জনশুমারির আগের ১২ মাসে যেসব হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করেছে, তাদের তালিকাভুক্ত করেছে।
বিবিএসের হিসাব বলছে, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাবধারীদের মধ্যে ৩১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ হচ্ছে পুরুষ এবং ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ নারী। এর মধ্যে গ্রামে রয়েছে হিসাবধারীদের ২২ দশমিক ৫১ শতাংশ আর শহরে রয়েছে ৩১ দশমিক ২৬ শতাংশ।
বিভাগওয়ারি হিসেবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঢাকার মানুষের। এই বিভাগের ২৮ দশমিক ১৭ শতাংশের মানুষের হিসাব রয়েছে। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান, যেখানকার ২৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ মানুষের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব রয়েছে।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ। এই বিভাগের ২৭ দশমিক ১ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। আর সবচেয়ে কম ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যাংক হিসাব রয়েছে সিলেট বিভাগের মানুষের।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশে ৩৯ দশমিক ১১ শতাংশ ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট। এর মধ্যে পুরুষ অ্যাকাউন্টধারীদের হার ৫২ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং নারী অ্যাকাউন্টধারীদের হার ২৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাংকব্যবস্থা মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি হাতে গোনা কয়েকটি শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। দেশ স্বাধীনের পর সরকারি ব্যাংকগুলো বিভাগীয় শহর পর্যায়ে শাখা খুলতে শুরু করে। ১৯৮৩ সালে বেসরকারি খাতের ব্যাংক চালু হওয়ার পর শুরু হয় জেলা শহরে শাখা খোলা। শহরে একটি নতুন শাখা হলে গ্রামেও সমান শাখা খুলতে হবে ২০১১ সালে এমন সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে শহরের পাশাপাশি গ্রামেও বিস্তৃত হয় ব্যাংক শাখা। ব্যাংকিংসেবা চলে যায় মানুষের আরও কাছাকাছি।
ব্যাংকের বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দেশজুড়ে নানা ধরনের আর্থিক সেবা প্রদান করছে। ব্যাংকের মতো এসব প্রতিষ্ঠানেও মেয়াদি আমানত রাখা যায়, মিলছে ব্যাংকঋণও। সারা দেশে ৩০১টি শাখার মাধ্যমে আর্থিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান।