চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কম রপ্তানি করেছেন ব্যবসায়ীরা। যার ফলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর রপ্তানি আয় কমেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে ৭ হাজার ৭৪১ কোটি টাকার কম রপ্তানি করেছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশ কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
তথ্য মতে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় হয় ৩৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকার, যা তৃতীয় প্রান্তিকে কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকায়। তবে ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৩৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।
রপ্তানির পাশাপাশি আমদানি বাণিজ্যও কম হয়েছে এ ব্যাংকগুলোতে। তৃতীয় প্রান্তিকে আমদানি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকের চেয়ে ৮ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৪৭ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছিল ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। ডলার সংকটে কড়াকড়ি আরোপের কারণে আগের বছরের তুলনায়ও ব্যাপক হারে কমেছে আমদানি। ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের তুলনায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানি কমেছে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ২৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।
অবশ্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কম হলেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। আলোচিত প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮ হাজার ৪৭ কোটি টাকার সমপরিমাণের বিদেশি মুদ্রা, যা আগের প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) ছিল ২২ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ২৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ডলারের দাম বাড়ায় আগের বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের তুলনায়ও রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের তুলনায় চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে ইসলামি ধারার বাইরে ব্যাংক খাতে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।
আলোচিত সময়ে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ খাতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সেপ্টেম্বর শেষে আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকায়। যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা বেশি। আর ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের চেয়ে ১০ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বেড়েছে আমানত।
এরমধ্যে সম্পূর্ণ ইসলামি ১০টি ব্যাংকের আমানত দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। প্রথাগত ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখার আমানত দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৪ ও ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডোর আমানত দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। আমানত গ্রহণের হারে এগিয়ে আছে ইসলামী ব্যাংক। এ ব্যাংকটি মোট আমানতের ৩৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ সংগ্রহ করেছে। এর পরের অবস্থানে ছিল এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৭ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে এ ধারার ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৯ হাজার ০৭১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা বেশি। ব্যাংকিং খাতের মোট ২৮ শতাংশ ঋণ ও বিনিয়োগ প্রদান করেছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। ফলে এ খাতের ব্যাংকগুলোর আমানত ও বিনিয়োগ অনুপাত হয়েছে শতকরা ৯১ টাকা। এরমধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করেছে ৪ লাখ ২ হাজার ২৭০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য ব্যাংকের ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগ হয়েছে ২৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।
তবে তৃতীয় প্রান্তিকে এসে ইসলামি ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য কমে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকায়, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য কমেছে ৯২৩ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় অতিরিক্ত তারল্য কমেছে ৯ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।
এদিকে তিন মাসে প্রথাগত ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিংসহ ইসলামি ধারার শাখা বেড়েছে মাত্র ৭টি। আগের প্রান্তিকে ১ হাজার ৬৯৪টি শাখা থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০১টি। এক বছরের ব্যবধানে শাখা বেড়েছে ৭৩টি। এসব শাখায় সর্বমোট ৫০ হাজার ১৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিরত রয়েছেন। যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে মাত্র ১২৭ জন।
সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে এখন পর্যন্ত ১০টি ইসলামিক ব্যাংকের ১ হাজার ৬৭১টি শাখা রয়েছে। এছাড়া প্রথাগত ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা রয়েছে ১৫টি ব্যাংকের ৩০টি। পাশাপাশি ১৬টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো রয়েছে ৬১৫টি।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর শেষে দেশের প্রথাগত ব্যাংকিং খাতের আমানত দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এ ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ হয়েছে ১৫ লাখ ৩২ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে ব্যাংকগুলোর ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। প্রথাগত ব্যাংকগুলোর সারা দেশে মোট ১১ হাজার ২১৯টি শাখা রয়েছে।