জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) দর্শন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী ঈশিকা ইশরাত। গত ৩০ নভেম্বর অনলাইনে ক্লাস শুরুর মাধ্যমে ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবন’ শুরু হয়েছে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের (৫২ ব্যাচ) এই শিক্ষার্থীদের। তবে প্রথম বর্ষের প্রথম দিন সশরীরে ক্লাস করতে না পারায় ক্ষুব্ধ ঈশিকা।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাস করব ক্যাম্পাসের সুন্দর পরিবেশে সহপাঠীদের সঙ্গে। প্রথম বর্ষের নতুন জীবন শুরু হবে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডায়-ভালোবাসায়। কিন্তু অনলাইনে সেই সুযোগ কোথায়? প্রশাসনের উচিত দ্রত সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা।’
শুধু ঈশিকাই নয়, স্বপ্নের ক্যাম্পাস ছেড়ে ঘরে বসে অনলাইন ক্লাসে অনিচ্ছুক তার অন্যান্য সহপাঠীরাও। বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘অনলাইনে ক্লাস করতে অনেক অসুবিধা হয়। নেটওয়ার্ক কাজ করে না সবসময়। ক্লাসে ঢুকতে দেরি হয়ে যায়। শ্রেণিকক্ষে সশরীরে ক্লাস হলে এই ভোগান্তি হতো না। অনলাইনে ক্লাস করতে ভালো লাগে না। আমরা চাই দ্রুত সশরীরে ক্লাস শুরু করা হোক।’
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা চলতি বছরের ১৮ জুন শুরু হয়ে ২২ জুন শেষ হয়। গত বৃহস্পতিবার থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে এই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের। হলে আবাসনের সুযোগ করে দিতে না পারায় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
চলতি বছরের ভর্তি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বলা হয়েছিল, নতুন হলগুলো চালু করে সেখানে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করে বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণ আবাসিক চরিত্রে ফিরিয়ে এনে ক্লাস শুরু করা হবে। এর মধ্যে ২১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটির সভায় ৩০ নভেম্বর থেকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। নবনির্মিত ছয়টি হলের মধ্যে চালু না হওয়া চারটি হলে কর্মচারী নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সেখানে ওঠাতে পারছে না বলে দাবি প্রশাসনের।
তবে আবাসন সংকটকে একটি দৃশ্যমান অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনলাইনে ক্লাস শুরু করা হলেও এই সংকট নিরসনে প্রশাসন জোরালো ও কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয় না বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসন তো ভর্তি পরীক্ষার অনেক আগে থেকেই জানত যে, নবীন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসবে। তারা চাইলেই নতুন হলগুলো চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারত। হল থেকে অছাত্রদের বের করে দিতে পারত। কিন্তু সেদিকে মনে হয় তাদের খেয়ালই ছিল না। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সশরীরে ক্লাশ শুরু না করতে পারাটা প্রশাসনের ব্যর্থতা। আবাসন সংকটের অজুহাত না দিয়ে সংকট নিরসনে কাজ করলে এতদিনে সমস্যা সমাধান হয়ে যেত।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাবির ১৭টি আবাসিক হলে আসন রয়েছে ১০ হাজার ২৯৬টি। প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সেই হিসেবে আবাসিক হলে স্নাতক পর্বের চার বর্ষের এবং স্নাতকোত্তর পর্বের এক বর্ষ মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার বৈধ শিক্ষার্থী থাকার কথা। কিন্ত আবাসিক হলগুলোর চিত্র আলাদা। শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও শিক্ষার্থীরা অবৈধভাবে হলের আসন দখল করে রাখেন। তবে ছাত্রী হলগুলোতে প্রশাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকায় এই চিত্র কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও ছাত্রদের হলগুলোতে এই অবৈধ চর্চার ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ২০১৮-এর ৫(ট) ধারা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তর চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষা সমাপ্তির সাত দিনের মধ্যে তাদের পরিচয়পত্র, চিকিৎসা ও গ্রন্থাগার কার্ড ফেরত দিয়ে নিজ নিজ আবাসিক হল ত্যাগ করবেন। একই ধারায় এ বিধি অমান্য করার শাস্তি হিসেবে উল্লেখ আছে, যারা এ বিধি অমান্য করবেন, তাদের ফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে। কিন্তু ছাত্র শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের এ ধারা না মেনে ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরেও হলে অবস্থান করছে বহু শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, ফার্মেসি বিভাগ বাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম ব্যাচ (২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ) পর্যন্ত সব বিভাগেই মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) শেষ হয়েছে। ৪৬তম ব্যাচের (২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ) বেশিরভাগ বিভাগে মাস্টার্স শেষ হয়েছে এবং কয়েকটি বিভাগে পরীক্ষা চলছে। এসব শিক্ষাবর্ষ ছাড়াও ৪৪, ৪৩ ও ৪২ ব্যাচের মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী হলে অবৈধভাবে আসন দখল করে রেখেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিগার সুলতানা বলেন, ‘নতুন হলগুলোতে কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হলেই সেগুলো চালু করে শিক্ষার্থীদের তুলে সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হবে। আর অছাত্রদের হল থেকে অপসারণের জন্য কাজ করছি। আমরা এর আগে ৪৫, ৪৪, ৪৩ ও ৪২তম ব্যাচ নিয়ে কাজ করেছি। এখন ৪৬তম ব্যাচের যেসব শিক্ষার্থীর মাস্টার্স শেষ হয়েছে তাদের তালিকা নিয়ে হল থেকে বের করে দেওয়ার জন্য কাজ করছি।’
এ প্রসঙ্গে জাবি উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম বলেন, ‘নতুন চারটি হলে কর্মচারী নিয়োগে একটু জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে নিয়োগের জন্য টেন্ডার দিতে দেরি হওয়াতেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। এজন্য নতুন চারটি হল চালু করতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। দ্রুতই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে হল চালু করে শিক্ষার্থীদের সেখানে তুলে সশরীরে ক্লাস শুরু করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো হলে অবৈধ শিক্ষার্থী না থাকে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক থেকে যাদের মাস্টার্স শেষ, তাদের তালিকা পাঠিয়েছি। অতি দ্রুত এই সমস্যা সমাধান হবে।’