একসময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই বিবিএ-এমবিএ। ফলে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে এই বিভাগ। তবে সেখান থেকে ফিরে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কর্মবাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষার্থীদের চাহিদায়ও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে আছে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলো। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৪৩ শতাংশই পড়ছেন প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল ৯৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এতে মোট শিক্ষার্থী ৩ লাখ ১০ হাজার ১০৭ জন। মোট শিক্ষার্থীর ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮৪ জন অর্থাৎ ৪৩.৩২ শতাংশ পড়ছেন প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে। এরপর ব্যবসায় প্রশাসনে ৭১ হাজার ৩৮৬ (২৩.০১ শতাংশ), কলা ও মানবিকে ৩২ হাজার ৭১৩ (১০.৫৪ শতাংশ), সামাজিক বিজ্ঞানে (অর্থনীতিসহ) ৯ হাজার ৭৪ (২.৯২ শতাংশ), শিক্ষায় ১ হাজার ৬৫ (০.৩৪ শতাংশ), চারুকলায় ৯৯৬ (০.৩২ শতাংশ), বিজ্ঞানে ২১ হাজার ৮৫২ (৭.০৪ শতাংশ), জীববিজ্ঞানে ৩ হাজার ৪০৭ (১.১০ শতাংশ), আইন বিষয়ে ১৯ হাজার ১৫৫ (৬.১৭ শতাংশ), ফার্মেসিতে ১০ হাজার ৪৪৮ (৩.৩৭ শতাংশ), কৃষিবিজ্ঞানে ১ হাজার ৫৯২ (০.৫১ শতাংশ) শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ের চাহিদা বাড়লেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিষয় খোলা ও আসন বাড়ানো সহজ ব্যাপার নয়। কারণ সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দক্ষতা ও আগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক, ল্যাবরেটরিসহ আনুষঙ্গিক মানদ- যথাযথভাবে পূরণ করতে হয়। ফলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কলা ও মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে হচ্ছে। এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে শিক্ষার্থী বাড়ছে।
জানা যায়, পুরনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলো খুব বেশি সুযোগ না থাকায় সরকার বেশ আগে থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াচ্ছিল। তবে তা এখন আবার যুগোপযোগী করে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখন মোবাইল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, অটোমোবাইল, আইসিটিসহ নানা পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। বিশ্বমানের একাধিক কারখানা তৈরি হয়েছে। আগে থেকেই চলমান গার্মেন্টস, টেক্সটাইলের উচ্চপদে বিদেশিদের প্রাধান্য থাকলেও এখন তা দেশীয়দের দখলে আসছে। ফলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে ব্যবহারিকে জোর দেওয়ায় বিদেশেও এসব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
জানা যায়, দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজির মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এসব বিষয়ে ভর্তি হতেও শিক্ষার্থীদের কাড়াকাড়ি পড়ছে।
সূত্র জানায়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, আহ্ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, টেকনোলজি অ্যান্ড এগ্রিকালচার-আইইউবিএটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়।
অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০২১ সালে জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধিভুক্ত ও অঙ্গীভূত কলেজ ছাড়া ৪৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিলেন ২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৪৫ জন। এর মধ্যে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে শিক্ষার্থী ছিলেন ৫২ হাজার ১, কলা ও মানবিকে ৪২ হাজার ২৫২, সামাজিক বিজ্ঞানে ৪৫ হাজার ২৫৭, শিক্ষায় ৭ হাজার ৯৬৯, চারুকলায় ২ হাজার ১৬৭, বাণিজ্যে ৩৯ হাজার ৩৯, আইনে ৭ হাজার ৮৭৯, ফার্মেসিতে ২ হাজার ৬০০, বিজ্ঞানে ৩৭ হাজার ১৮১, জীববিজ্ঞানে ১৮ হাজার ৮৫৮, চিকিৎসায় ৭ হাজার ৬৯২, কৃষিতে ১৯ হাজার ৩৭০ এবং অন্যান্য (এমফিল, পিএইচডি, উচ্চতর পর্যায়, ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট) পর্যায়ে ৮ হাজার ৩৮০ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করেছেন।