হবিটরা নাকি আজও আছে!

রূপকথার এক দেশ। ছোটবেলায় পড়া বইয়ের পাতায় যার খোঁজ মেলে। এ দেশে ঘরবাড়ি সব মাটির তলায়, সুন্দর দেখতে। দেখতে সুন্দর ঘরের ভেতরের বাসিন্দারাও, কিছুটা অদ্ভুতও বটে।

সরলমনের তারা, দল বেঁধে থাকে। কাজের সময় কাজ করে, খাওয়ার সময় খায়। কাজশেষে আড্ডা-ফুর্তি। এড়িয়ে চলে অশান্তি-গোলমাল। অলস এরা, দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে- ঘুমোতেও যায় দেরিতে। তবে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ভীষণ উদার। দিনে ছয়বার খেতে দিলেও আপত্তি নেই।

তবে অকারণে ঝামেলায় না জড়ালেও এদের গোষ্ঠীবোধ জোরাল। বিপদ এলে জোট বাঁধতে দেরি করে না। তখন পাল্টা লড়াই করতেও প্রস্তুত। নিজেদের ভূমি বাঁচাতে প্রয়োজনে প্রাণ দিতেও দুবার ভাবে না।

চেহারা মানুষের মতোই। শুধু সাধারণ মানুষের যা উচ্চতা, এরা তার অর্ধেকেরও কম। গায়ের রং লালচে ফরসা। চোখ সামান্য গোল গোল। মাথার সমান দীর্ঘ কানের আগা দুটো সুচাল। আর মাথায় গাঢ় বাদামি রঙের ঘূর্ণি পাকানো চুল। উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরতে ভালোবাসে। পছন্দের রং হলুদ কিংবা সবুজ। তবে পোশাক যা-ই হোক, তার সঙ্গে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সারা বছরই থাকে গরম ওয়েস্টকোট। সেজেগুজেও এরা থাকে খালি পায়ে। জুতো-মোজা পরে না এরা। কারণ এদের পায়ের নিচে থাকে জুতোর মতোই শক্ত চামড়ার আস্তরণ। পায়ের পাতার ওপর আছে ঘন লোম। মানুষের সঙ্গে এখানেই এদের পার্থক্য।

নাম ‘হবিট’। এদের কথা মানুষ প্রথম জানতে পারেন ইংরেজ লেখক জে আর আর টলকিনের উপন্যাসত্রয়ী ‘লর্ড অব দ্য রিং’ এবং তার প্রাক-ভাস ‘দ্য হবিট’-এ। পরে হলিউডে একটি ব্লকবাস্টার ফিল্ম সিরিজও হয় এদের নিয়ে। বিখ্যাত হয়েছিল সেই সিরিজ। সিনেমায় হবিটদের দেখে তাদের পছন্দ করে দর্শক। তার কারণও ছিল। হবিটদের সব কিছুই একটু অন্য রকম। নিজের জন্মদিনে এরা উপহার নেয় না, বিলায়।

অবিশ্বাসীরা বলবেন- এসব তো টলকিনের কল্পনা। কিন্তু ইতিহাস বলছে, হবিটদের অস্তিত্ব সত্যিই ছিল পৃথিবীতে। বিজ্ঞানীরা তাদের কঙ্কালও খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে এ-ও জানিয়েছিলেন, ১২ হাজার বছর আগেই নির্বংশ হয়েছিল হবিটেরা। তবে তার আগে পৃথিবীতে তারা টিকেছিল প্রায় ৫০ হাজার বছর।

যদিও সম্প্রতি সে ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল বলে দাবি করেন এক নৃতত্ত্ববিদ, গ্রেগরি ফোর্থ। বিজ্ঞানবিষয়ক ‘সায়েন্টিস্ট’  পত্রিকায় এ নিয়ে একটি নিজস্ব মতামতমূলক লেখাও লেখেন তিনি। যেখানে ফোর্থ দাবি করেন, হবিটদের বাস্তব অস্তিত্ব ছিল এবং তারা আজও আছে। ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে তাদের বসবাস।

কিসের ভিত্তিতে এই দাবি করেছেন তিনি? ফোর্থ বলেন, ইন্দোনেশিয়ার ওই অঞ্চলের বহু প্রত্যক্ষদর্শীই জানিয়েছেন, তারা স্বচক্ষে দেখেছেন বিশেষ ধরনের বেঁটেখাটো অদ্ভুতদর্শন মানুষদের। তাদের চোখ গোলগোল। কান বড় এবং সুচালো। গায়ের রং পরিষ্কার। তবে হাবভাব কিছুটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের মতো।

ফোর্থ জানিয়েছেন, এমন অন্তত ৩০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তার মনে হয়েছে, লোকালয়ে এমন অদ্ভুত দর্শন জীবের অস্তিত্বের কথা জেনে কিছুটা ভয়ই পেয়েছেন স্থানীয়রা। ইন্দোনেশিয়ার ওই অঞ্চলে ৫০ হাজার বছর আগে খর্বকায় একপ্রকার মানুষ জাতীয় প্রাণীর যে অস্তিত্ব ছিল, সে কথা কিন্তু বেশ কিছু নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়। ওই অঞ্চলের লং বুয়া নামের এক চুনাপাথরের গুহায় ৯টি এমন কঙ্কালর সন্ধান পান প্রত্নবিদেরা। এদের ‘হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস’ নাম দেওয়া হয়।

২০০৩ সালে ইন্দোনেশিয়ায় গবেষণা চালাতে গিয়ে এদের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে, এদের অস্তিত্ব এই বিশেষ দ্বীপটিতেই আবদ্ধ ছিল বলে জানান গবেষকরা। জীবাশ্মগুলো থেকে জানা যায়, এদের উচ্চতা ছিল সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ ফুট। এদের সভ্যতাকে ‘প্রস্তরযুগীয়’ বলেই চিহ্নিত করেন প্রত্নবিদরা।

গবেষক ফোর্থ দাবি করেন, হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস বা বাস্তবের হবিটরা আজও আছে। যেহেতু স্থানীয় মানুষ তাদের ভয় পান, সে কারণে তারা আজকের মানুষের দ্বারা আক্রান্তও হতে পারে।

যদিও ফোর্থের এই তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়েছেন অনেকেই। তাদের কথায়, বিলুপ্ত এক প্রাণীর এসময় বেঁচে থাকার তত্ত্ব একটু বেশিই আজগুবি।