গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস মাওলানা আঃ রউফ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি স্ত্রী, চার ছেলে ও চার মেয়েসহ অসংখ্য ছাত্র-শিষ্য ও গুণগ্রাহী রেখে যান।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে ফজরের নামাজের পর গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দুপুর আড়াইটায় মাদ্রাসা ময়দানে জানাজা হয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব ও গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি রুহুল আমীন জানাজায় ইমামতি করেন। পরে তাকে মাদ্রাসাসংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় মাওলানা জাফর আহমাদ, মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, দারুল উলুম খুলনার মাওলানা মোস্তাক আহমাদ, মাওলানা রফিকুর রহমানসহ দক্ষিণাঞ্চল ও বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের আলেম-উলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
মাওলানা আঃ রউফ মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর হাতেগড়া শিষ্য ও করাচির হজরতখ্যাত আল্লামা হাকিম মোহাম্মদ আখতার (রহ.)-এর খলিফা ছিলেন। তিনি গওহরডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় বোখারি শরিফের দরস প্রদান করতেন।
মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) যেভাবে উম্মতের প্রতি থাকা দায়বোধ থেকে নিজেকে মানবিকতার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, শায়খুল হাদিস মাওলানা আঃ রউফ সেই মিশনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ওস্তাদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি পুরো জীবন গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায় কাটিয়ে দেন।
মাওলানা আঃ রউফ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে ‘ঢাকার হুজুর’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। তার ইন্তেকালের খবরে দেশের আলেমসমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে। মাদ্রামায় মাদ্রাসায় কোরআন খতম ও বিশেষ দোয়া করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে মাগফিরাত কামনা করেছে।
পৃথক পৃথক শোকবাণীতে তারা বলেন, মাওলানা আঃ রউফ ছিলেন একজন মুহাক্কিক আলেম। তার অনেক সাগরেদ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে। তিনি গওহরডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় হাদিস শরিফের দরস প্রদান করতেন। তিনি দ্বীনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। তার ইন্তেকালে দেশবাসী একজন সত্যনিষ্ঠ আলেমকে হারাল। যার অভাব অনেক দিন অনুভূত হবে। মহান আল্লাহ তার সব নেক আমল কবুল করে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং পরিবার পরিজনকে ধৈর্য ধারণের তওফিক দিন।
মাওলানা আঃ রউফ মুন্সীগঞ্জের (বিক্রমপুর) সিরাজদীখান উপজেলার বাহেরকুচি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৩৬ সালের ৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। দুই বছরে পবিত্র কোরআন হেফজ সম্পন্ন করেন এবং লালবাগ মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। পরে সদর সাহেব (রহ.)-এর নির্দেশে হাদিস বিষয়ে উচ্চশিক্ষা (উলুমুল হাদিস) অর্জনের জন্য পাকিস্তানে হজরত বিননুরী (রহ.)-এর কাছে যান। সেখানে উলুমুল হাদিস পড়া শেষ হলে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার ওস্তাদ হিসেবে নিয়োগ পান। মৃত্যু আগপর্যন্ত তিনি সেখানেই নায়েবে মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ঢাকার অন্তত ১২-১৩টি মাদ্রাসায় বোখারির দরস দিয়েছেন। অনুমান করা হয়, তিনি অন্তত ৫০ বারের বেশি পবিত্র হজ পালন করেছেন।
মাওলানা আঃ রউফকে নিয়ে দৈনিক দেশ রূপান্তরের দৈনন্দিন ইসলাম পাতায় ‘ওস্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অনন্য নজির’ শিরোনামে জীবনালেখ্য চলতি বছর ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়।