বয়স বাড়লে হয় না বুড়ো

বাংলায় প্রচলিত কথা হলো চুল পাকলেই বুড়ো হয় না। আর বিজ্ঞানের নতুন গবেষণা বলছে বয়স হলেই লোকে বুড়িয়ে যায় না। সায়েন্টিফিক আমেরিকা অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বয়স বলতে সাধারণত আমরা বুঝি যার যার জন্মদিনের সংখ্যা। প্রতিবছর জন্মদিন এলেই মানুষ বুঝে নেয় তার বয়স আরও বাড়ল। তবে বিজ্ঞান বলছে এখানে একটা ‘কিন্তু’ আছে। বয়স তো আসলে বাড়ে শরীরে, সংখ্যায় না। শরীরের ভেতরে থাকা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কতটা সবল ও সক্রিয় আছে তা দিয়ে বয়সের আসল পরিমাপ হয়। এক নতুন সমীক্ষায় গবেষকরা জানাচ্ছেন, মানবশরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন হারে ‘বয়স্ক’ হয়ে যায়। তারা বলছেন, মানুষের ‘জৈবিক বয়স’ ক্যালেন্ডারে বাড়তে বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। উল্টো হতে পারে। অর্থাৎ সংখ্যায় বয়স কম, কিন্তু শারীরিকভাবে বয়স্ক হয়ে যেতে পারেন কেউ কেউ। আবার সংখ্যার দিক দিয়ে তুলনামূলক বয়স্ক হলেও শারীরিক গঠনে দেখা গেল কেউ আবার তরুণ।

বয়স বাড়ে কেন

কেউ জানে না কীভাবে এবং কেন মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। কিছু তত্ত্ব দাবি করে যে, বার্ধক্য দীর্ঘ সময় ধরে অতিবেগুনি রশ্মির প্রতিক্রিয়া, শরীরের ওপর নানা ধরেন বাহ্যিক ক্রিয়া এবং বিপাক বা বিপাকের উপজাতের কারণে ঘটে। অন্যান্য কিছু তত্ত্ব আছে, যারা বার্ধক্যকে জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে।

কোনো একক প্রক্রিয়া বার্ধক্যের সব পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারে না। বার্ধক্য একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা কীভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করে তার তারতম্য আছে। বেশির ভাগ জেরন্টোলজিস্ট (যারা বার্ধক্য নিয়ে অধ্যয়ন করেন) মনে করেন, বার্ধক্য নানা ধরনের মিথস্ক্রিয়ার ফলে ঘটে। এ প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে বংশগতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি, খাদ্য, ব্যায়াম, অবসর, অতীতের অসুস্থতা এবং অন্যান্য অনেক কারণ।

বয়ঃসন্ধিকাল সব মানুষের জীবনে প্রায় একই সময়ে এলেও এর পরের জীবন থেকে পার্থক্য শুরু হয়। যেমন কারও কারও ক্ষেত্রে ৩০ বছর বয়স থেকে বার্ধক্য শুরু হয়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে শরীরে বার্ধক্যের প্রক্রিয়া শুরু হতে আরও বেশি সময় নেয়।

বয়স হওয়া মানে শরীরে ক্লান্তি আসে, চলার শক্তি কমে যায়, কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। তবে সবার ক্ষেত্রে একই সময়ে এসব ঘটে না। কেউ আগে থেকেই ক্লান্ত হয়ে যায়। অনেক সময় বয়স্ক ব্যক্তিও অন্য কোনো তরুণের মতো সবল থাকেন। তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করে যেতে পারেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর কারণ শরীরে অঙ্গের বয়স বেড়ে যাওয়া।

মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কোষে জৈব রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত যা মানবদেহকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু প্রোটিন অনুসন্ধান করে এমন একটি নতুন অধ্যয়ন হয়েছে, যা পরামর্শ দেয় যে এই পরিবর্তনগুলো অভিন্ন নয়।

গবেষণা

মানব শরীরের অঙ্গগুলো কত ভালোভাবে কাজ করে তা নির্ভর করে তাদের ভেতরের কোষ কতটা ভালোভাবে কাজ করে তার ওপর। পুরনো কোষ কম ভালো কাজ করে। এ ছাড়া কিছু অঙ্গে কোষগুলো মারা যায় এবং প্রতিস্থাপিত হয় না, তাই কোষের সংখ্যা হ্রাস পায়। অণ্ডকোষ, ডিম্বাশয়, লিভার এবং কিডনিতে কোষের সংখ্যা শরীরের বয়স বাড়ার সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। যখন কোষের সংখ্যা খুব কম হয়ে যায়, তখন একটি অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। এভাবে, বেশিরভাগ অঙ্গ মানুষের বয়সের সঙ্গে কম ভালোভাবে কাজ করে। যাই হোক, সব অঙ্গ প্রচুর পরিমাণে কোষ হারায় না। মস্তিষ্ক একটি উদাহরণ।

বুধবার নেচার ডটকমে নতুন একটি গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, বয়স ৫০ বছরের বেশি হয়ে গেছে, এমন প্রতি পাঁচ সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে একজনকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে, যার শরীরে ‘চরম বার্ধক্য’ চলে এসেছে। ওই ব্যক্তির শরীরে সমবয়সীদের তুলনায় কোনো না কোনো অঙ্গে বার্ধক্য দেখা দিয়েছে। গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, ৬০ প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজনের দুটি বা ততোধিক অঙ্গে দ্রুত বার্ধক্য ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষণা দল প্রোটিন সংশ্লিষ্ট অঙ্গ যেমন মস্তিষ্ক, হৃদয়, পরিপাক টিস্যু এবং কিডনি পরিমাপ করেছে। গবেষকরা আশা করছেন, তাদের ফলাফল ভবিষ্যতের রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া এসব অঙ্গ চিহ্নিত করতে পারবে। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসার গতিমুখ বুঝতে পারবেন।

ওই গবেষক দল নির্দিষ্ট এসব অঙ্গ থেকে উদ্ভূত প্রোটিন সন্ধান করতে ৫৫০০ জনেরও বেশি মানুষের রক্তের নমুনা নেয়। যাদের কেউ রোগাক্রান্ত ছিলেন না অথবা গুরুতর কোনো রোগ ও দুর্ঘটনায়ও তারা আক্রান্ত হননি। গবেষকরা প্রোটিনের জিনের ক্রিয়াকলাপ পরিমাপ করে সেগুলো কোন অঙ্গ থেকে এসেছে তা নির্ধারণে সক্ষম হন। এর জন্য তারা একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন। সেটি হলো, যখন কোনো প্রোটিনে থাকা জিন একটি অঙ্গে চারগুণের বেশি উপস্থিত থাকে, তাহলে তা থেকে ওই প্রোটিনের উৎস নির্বাচন করা যায়।

এরপর তারা পরিমাপ করেন রক্তে প্রোটিনের উপস্থিতির পরিমাণ। এক ফোঁটা রক্তে হাজারো প্রোটিনের ঘনত্ব থাকে। বয়স অনুপাতে সেই ঘনত্বের তারতম্য দিয়ে বুঝতে পারা যায় নির্দিষ্ট ওই অঙ্গে বার্ধক্য এসেছে কিনা।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির নিউরোলজির অধ্যাপক এবং এ গবেষণার সহ-লেখক টনি উইস-কোরে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা যুক্তিসঙ্গত নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি যে [একটি বিশেষ প্রোটিন] সম্ভবত মস্তিষ্ক থেকে আসে এবং কোনো না কোনোভাবে রক্তে মিশে যায়। যদি সেই প্রোটিনের ঘনত্ব রক্তে পরিবর্তিত হয়, যা সম্ভবত মস্তিষ্কেও পরিবর্তন হতে পারে এবং এ পরিবর্তন মস্তিষ্কের বয়স সম্পর্কে আমাদের কিছু তথ্য দেয়।

অধ্যয়নে অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা এটি অনুমান করতে সক্ষম হন যে, একটি অঙ্গের জৈবিক বয়স এবং এর কালানুক্রমিক বয়সের মধ্যে পার্থক্য আছে। অর্থাৎ বয়সে নবীন হলেও দেখা গেল অঙ্গে বার্ধক্য চলে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ তরুণ হলেও যদি তার হার্ট স্বাভাবিকের চেয়ে ‘বয়স্ক’ হয়, তাহলে তার ‘হার্ট ফেইলিউরের’ ঝুঁকি সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বয়স হৃদযন্ত্রকে আক্রমণ করার একটি শক্তিশালী কারণ। একইভাবে, যাদের মস্তিষ্ক দ্রুত বার্ধক্য পায় তাদের বোধশক্তি লোপ পায়। মস্তিষ্ক এবং রক্তনালি ব্যবস্থায় বার্ধক্য আসলে বুঝতে হবে ওই রোহী আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হতে যাচ্ছেন। কিডনিতে বার্ধক্য আসলে তা উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের একটি শক্তিশালী পূর্বাভাস।

জৈবিক ঘড়ি

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুলার জেরোন্টোলজির অধ্যাপক পল শিলস অবশ্য এ গবেষণার সমালোচনা করে বলেছেন, এ গবেষণায় শুধু বয়স্ক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

উইস-কোরে যদিও বলেছেন, জৈবিক বার্ধক্য পরিমাপ একটি বিকশিত বিজ্ঞান। ‘এপিজেনেটিক ঘড়ি’ নামে একটি প্রযুক্তি জৈবপ্রযুক্তি গবেষক স্টার্ট-আপ অ্যালটস শুরু করেছে। স্টিভ হরভাথ যার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। বিদ্যমান অন্যান্য জৈবিক বয়স অনুমানকারীদের তুলনায় কোষের বয়স আরও সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে যারা ডিএনএ পরীক্ষা করে। ডিএনএর পরিবর্তনের মাধ্যমে বয়স নির্ধারণ করে। মানুষের বয়স তার শরীরে থাকা ডিএনএতে স্বাক্ষর রাখে। যার মাধ্যমে বুঝতে পারা যায় শরীর কতটা পুরনো। ‘এপিজেনেটিক ঘড়ি’ একটি নির্দিষ্ট অঙ্গের বয়সের পরিবর্তে সমগ্র শরীরের বয়স অনুমান করতে পারে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির জিন গবেষক মাইকেল স্নাইডার একটি ‘এজিওটাইপস’ তৈরি করেছেন, যা বার্ধক্য নির্ণয়ের জন্য চারটি অঙ্গকে অবলম্বন করে। সেগুলো হলো, কিডনি, লিভার, ইমিউন ব্যবস্থা এবং সাধারণ বিপাক।

উইস-কোরে অনুমান করেন যে, তাদের গবেষণার ফলাফল সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ অসুস্থতার পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করতে পারে। যার ফলে চিকিৎসক সেই ব্যক্তি কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সতর্ক করতে পারবে।

বার্ধক্য সুন্দর

ড. শর্মিষ্ঠা ঘোষ লিখেছিলেন বার্ধক্য মানবজীবনের এক অনিবার্য পরিণতি। হাজার হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের বৈদিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যেও বার্ধক্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে দেখা যায়। প্রাচীন শাস্ত্রগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম বা দর্শনে বার্ধক্য নিয়ে সর্বাপেক্ষা বেশি আলোচনা করতে দেখা যায়। কারণ কার্যকারণ তত্ত্বে বিশ্বাসী গৌতম বুদ্ধ মানবজীবনকে দুঃখের হাত থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তার অনুসন্ধানের জন্য দুঃখের স্বরূপ উদ্ঘাটন ও তা থেকে মুক্তির পথ অন্বেষণ করেছেন। বৌদ্ধ দর্শনে বার্ধক্য এক প্রকার দুঃখ। তবে বার্ধক্য কোনো দুঃখ নয়, বার্ধক্য দেহের ধর্ম। এই বার্ধক্য সম্পর্কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে।

সাহিত্যে নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বার্ধক্য কোনো কোনো মানুষকে পরাভূত করিয়া পদানত করে, আবার কোনো কোনো মানুষের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করিয়া তাহার সঙ্গে বন্ধুর মতো বাস করে। ইঁহার শরীরমনে বার্ধক্য তাহার জয়পতাকা তুলিতে পারে নাই। আশ্চর্য ইঁহার নবীনতা। আমার বারবার মনে হইতে লাগিল, বৃদ্ধের মধ্যে যখন যৌবনকে দেখা যায় তখনই তাহাকে সকলের চেয়ে ভালো করিয়া দেখা যায়। কেননা, সেই যৌবনই সত্যকার জিনিস; তাহা শরীরের রক্তমাংসের সহিত জীর্ণ হইতে জানে না; তাহা রোগতাপকে আপনার জোরেই উপেক্ষা করিতে পারে। তাঁহার দেহের আয়তন বিপুল, তাঁহার মুখশ্রী সুন্দর; কেবল তাঁহার পীড়িত পায়ের দিকে তাকাইয়া মনে হইল, অর্জুন যখন দ্রোণাচার্যের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন তখন প্রণামনিবেদনের স্বরূপ প্রথম তীর তাঁহার পায়ের তলায় ফেলিয়াছিলেন, তেমনি বার্ধক্য তাহার যুদ্ধ-আরম্ভের প্রথম তীরটা ইঁহার পায়ের কাছে নিক্ষেপ করিয়াছে।’

কবি এখানে তার চোখ দিয়ে বার্ধক্যকে পরিমাপ করেছেন। তবে বিজ্ঞানীরা সৌন্দর্য নয়, কাজ করেন তথ্য নিয়ে। তাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ যদি বয়োপ্রাপ্ত হয়, তাহলে মানবশরীরে বয়সের লক্ষণ দেখা দেয়। তাদের গবেষণা বলছে, যদি এসব লক্ষণ আগে থেকেই ধরে ফেলা যায় তাহলে মানব শরীরকে জটিল রোগবালাই থেকেও উদ্ধার করা সম্ভব হবে।