ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করা লাগবে না; এমন চিন্তা একটি কালচারে (সংস্কৃতিতে) পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি বলেন, ব্যাংকের ঋণখেলাপি এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তিন দিনের বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে এসব কথা বলেন তিনি।
সম্মেলনের শেষ দিনে অর্থনীতির নীতি চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই অধিবেশন হয়। রাজধানীর লেকশোর হোটেলে এই সম্মেলন হয়। এই অধিবেশনে সাবেক মন্ত্রী, আমলা, অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা অংশ নেন।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গভর্নর বলেন, ব্যাংকগুলোতে সুশাসন এবং অপর্যাপ্ত সম্পদও একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ঝুঁকি নিরসনে ঝামেলা হচ্ছে। ঋণখেলাপি কমানোর জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘এটা নিয়ন্ত্রণে আগামীতে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করব। কারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি আমরা।’
ব্যাংক খাতে এ মুহূর্তে তিনটি সমস্যা আছে। এগুলো হলোশ্ব সুশাসনের অভাব, খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এভাবেই ব্যাংক খাতের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন।
খেলাপি ঋণ কেন বাড়েশ্ব এর ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার জানান, মূলত চার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাবে অনেক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এ ছাড়া বহু পুরনো খেলাপি ঋণ আছে, যেগুলো বছরের পর বছর খেলাপি হয়ে আছে। অন্যদিকে ঋণখেলাপি হওয়ার সংস্কৃতিও আছে। তাদের মনোভাব এমন, ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিলেও চলবে। সর্বশেষ কারণ হলো, কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে আমরা পরিকল্পনা করছি।’
সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া। চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই মূল্যস্ফীতি হয়নি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে আব্দুর রউফ তালুকদার জানান, আগামী জুন মাসের মধ্যে এটি ৬ শতাংশে নেমে আসবে। ব্যাংক খাত থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ কোটি টাকা ঢুকছে। ঋণ আরও ব্যয়বহুল করা হয়েছে, যার ফলে গত মাসে মূল্যস্ফীতি কমেছে।
শামসুল আলম বলেন, যেহেতু অর্থনীতি এখন কিছুটা অস্থিতিশীলতার মধ্যে আছে। তাই বিদেশি ঋণ নেওয়ার সময় কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে। বিদেশ থেকে বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণে কিছু সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।
অধিবেশন সভাপতি ও বিআইডিএস মহাপরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ‘আশির দশকে আমরা বলতাম, ব্যাংকের পরিচালক হবেন এই খাতের অভিজ্ঞরা। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের পরিচালক হবেন না। কিন্তু এখন শুনি, ৯৫ বছর বয়সী একজন নারীকে ব্যাংকের পরিচালক বানানো হয়েছে। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক।’
নির্বাচনের পর বড় সংস্কার চাই : নির্বাচনের পর শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংস্কার করার তাগিদ দেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তার মতে, আর্থিক খাতের প্রায় সব জায়গায় ব্যবস্থাপনার সমস্যা আছে। এজন্য অর্থনীতি ভুগছে। নির্বাচনের পর সংস্কারের জন্য ক্ষমতাসীনদের একটি শক্তিশালী দল করা উচিত। ওই দলকে ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি জোর করে সংস্কারের মনোভাব থাকতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যেসব সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে, সেসব সংস্কার নিজেদের প্রয়োজনেই করা উচিত। তার মতে, মুদ্রাবিনিময় হার, সুদের হার, মূল্যস্ফীতিশ্ব এসব ঠিক করা জরুরি। এটি তাৎক্ষণিক সংস্কার। আর মধ্য মেয়াদে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।
ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ জহির বলেন, সংস্কারের জন্য প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। একটি ভাবাদর্শের ভিত্তিতে এই সংস্কার হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, সংসদে দ্বৈত নাগরিক বসে থাকবেন, তিনি ঋণ পেতে আগ্রহী হবেন। এই টাকা সহজে দেশের বাইরে চলে যাবে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম বক্তা ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান। কিন্তু তিনি আর্থিক খাতের সমস্যা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে ছোট-বড় বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করতে যেসব তহবিল আছে, এর বিবরণ দেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে আর্থিক খাতের অন্তর্ভুক্তি, সবুজ অর্থায়ন এসব বিষয়।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ে (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সদিচ্ছা লাগবে। কিন্তু এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো পরিকল্পনা দেখছি না। তাহলে সংস্কার কীভাবে হবে? তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ কমছে না, বরং বাড়ছে। কোনো উন্নতি দেখছি না। আবার অনেক সময় নিয়মের মধ্যেই ঋণখেলাপি হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু করার থাকে না।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় রাজস্ব খাতের সংস্কারে বাধা রাজস্ব প্রশাসন থেকেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারপারসন মাসুদা ইয়াসমিন মনে করেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কমিটি গঠন করা উচিত।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কানাডার কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মইনুল আহসান, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিস রিসার্চ, বাংলাদেশে (আইসিডিআরবি) নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ প্রমুখ।