কলেজে পড়ার সময় করতেন কৌতুক অভিনয়। কলেজ পাস করে ভর্তি হন মেডিকেল কলেজে। হওয়ার কথা ছিল ডাক্তার কিন্তু হয়ে গেলেন আলোকচিত্রী। শুধুমাত্র ফটোগ্রাফি করার জন্যই তিনি চিকিৎসাবিদ্যার পড়াশোনা বাদ দেন। বাল্যকাল থেকেই ফটোগ্রাফির প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড নেশা।
১৯৫৬ সালে হাইস্কুলে পড়ার সময় পাঁচ টাকার লটারি টিকিট জিতে পান ‘আগফা ফ্লিক’ নামের একটি ক্যামেরা। ওই ক্যামেরা দিয়েই ফটোগ্রাফি শুরু। ফটোগ্রাফির এই নেশাই শেষ পর্যন্ত তার পেশায় পরিণত হয়। এরপর সারা জীবন তিনি আলোকচিত্রে নিবিষ্ট থেকেছেন। আলোকচিত্রে নিমগ্ন থাকা এই মানুষটির নাম মোরতজা তওফিকুল ইসলাম। চট্টগ্রামের চিত্রিত ইতিহাস তার আলোকচিত্রে স্থির হয়ে আছে। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আলোকচিত্রের সুকুমার চর্চা, প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও ফটোসাংবাদিক হিসেবে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
মোরতজা তওফিকুল ইসলামের জন্ম সনদ অনুযায়ী ১৯৪১ সালে হলেও তার প্রকৃত জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৫ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে। তার পিতা সিরাজুল ইসলাম রাজশাহী ও চট্টগ্রাম কলেজের আরবির অধ্যাপক ছিলেন। মা জোবাইদা খাতুন ছিলেন ফটিকছড়ির রোসাংগিরীর জমিদার আরবান আলী সওদাগরের কন্যা।
চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি (মোরতজা তওফিকুল ইসলাম) তৃতীয়। ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মিডল ইংলিশ স্কুলে তার লেখাপড়া শুরু হয়। এরপর ভর্তি হন ইসলামিয়া হাইস্কুলের উর্দু মাধ্যমে। ১৯৫৭ সালে এই স্কুল থেকে তিনি মেট্রিক পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে পড়া শেষে ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ছবি তোলার নেশার কারণে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় এমবিবিএসের পাঠ অসমাপ্ত রেখেই তিনি ১৯৬২ সালে ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি ইস্টার্ন একজামিনারে ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন। চট্টগ্রাম বিপনী বিতানের ২৭ নম্বর দোকানে ১৯৬৪ সালে তিনি ‘ফটোরমা’ নামে একটি বাণিজ্যিক ফটো স্টুডিও স্থাপন করেন। ইস্টার্ন, জায়েদীস ও ওয়েদীসের পরে প্রতিষ্ঠিত হলেও ফটোরমা ছিল খুবই আধুনিক মানের স্টুডিও। শুরু থেকেই ফটোরমা স্টুডিওটি সৃষ্টিশীল মানুষের আড্ডাস্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
মোরতজা তওফিকুল ইসলাম ফটোসাংবাদিক হিসেবে চট্টগ্রামে বেশ সুপরিচিত ছিলেন। পাকিস্তান অবজারভার, দৈনিক ইত্তেফাক, এপিপি, পাক জমহুরিয়াত, ডন, জং ও কুহিস্তান পত্রিকার চট্টগ্রামস্থ প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট (পিআইডি)-এর সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটির (সিপিএস) সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৬ বছর সিপিএসের সভাপতি ছিলেন। ১৯৯০ সালে তিনি চট্টগ্রাম ফটো স্টুডিও মালিক কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ভিন্টেজ ক্যামেরা মিউজিয়ামের সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ইনস্টিটিউট অব অ্যাপলায়েড ফটোগ্রাফি (আইএপিসি)।
ফটোসাংবাদিক হিসেবে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ছবি তোলেন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম রাইফেলস ক্লাবে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার বিবাহোত্তর সংবর্ধনার সমস্ত ছবি তিনি তোলেন। বক্সার মোহাম্মদ আলী যখন চট্টগ্রামে আসেন তখন মোরতজা তৌফিকুল ইসলামের মোটর বাইকে ভ্রমণ করেন। সে সময় তিনি মোহাম্মদ আলীর অসংখ্য ছবি তোলেন। নোবেলবিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুস তার বাল্যবন্ধু ছিলেন। কলেজে পড়ার সময় তারা একসঙ্গে কমেডি করতেন।
মোরতজা তওফিকুল ইসলাম ১৯৯১ সালে সিপিএস আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর স্যালন চেয়ারম্যান মনোনীত হন। এছাড়া তিনি অসংখ্য জাতীয়-আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার বিচারকার্য পরিচালনা করেন। তিনি বিভিন্ন আলোকচিত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন প্রজন্মের আলোকচিত্রীদের প্রশিক্ষণ দেন। তিনি তার শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভারতের কলকাতা, দিল্লি, মাদ্রাজ, পাটনা, ব্যাঙ্গালোর ও কোয়েম্বাটুরে আন্তর্জাতিক কর্মশালা ও কনফারেন্সে দলপতি হিসেবে যোগদান করেন। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু অনারারি ফেলোশিপ ও পুরস্কার লাভ করেন। ফটোগ্রাফিতে সামগ্রিক অবদানের জন্য ইতালি, রুমানিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কয়েকটি ফটোগ্রাফি সংগঠন থেকে তিনি দশটির বেশি ফেলোশিপ লাভ করেন। তিনি ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা ২০১৪ পান। ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফিক কাউন্সিল তাকে এএসআইআইপিসি ও বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি এমবিপিএস উপাধিতে ভূষিত করেন। বিপিএস তাকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করে।
তিনি সাতটি একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও ২১টি যৌথ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। একক প্রদর্শনীর মধ্যে ১৯৮৫ সালে চট্টগ্রাম অলিয়স ফ্রঁসেসে ‘বাংলার রূপ যেমন দেখিয়াছি’ শীর্ষক প্রদর্শনী, ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম হল প্রাঙ্গনে ‘একুশের প্রত্যয়’ শিরোনামের প্রদর্শনী এবং একই বছর বান্দরবানে আদিবাসী জীবন নিয়ে প্রদর্শনী উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৪ সালে তিনি আগফা এইট এক্সপোজারের বক্স ক্যামেরায় চট্টগ্রামের নাজিরহাটের একটি ভাঙ্গা সেতুর ওপর ফোর্ড কোম্পানির একটি প্রাইভেটকার পার হওয়ার ছবি তোলেন। তিনি ছবিটির নাম দেন ‘শতবর্ষ’। ছবিটি ১৯৮৬ সালে জাপান অনুষ্ঠিত এশিয়ান কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেসকো আয়োজিত ‘স্ট্রিট অ্যান্ড পিপলস’ শীর্ষক প্রতিযোগিতায় ফুজি ফিল্ম পুরস্কার পায়।
একই বছর তার তোলা ‘বলদ ও ঠেলাগাড়ি’ শিরোনামের ছবিটি জাপানে ওকামাটো পুরস্কার পায়। ১৯৮৫ সালে নিক্কন ক্যামেরা কোম্পানি আয়োজিত সিঙ্গাপুরের নান ইয়ং টেকনলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের ‘ম্যান অ্যান্ড মেশিন’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় তার একটি ছবি সম্মানসূচক পুরস্কার লাভ করে। তিনি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘ভিজ্যুয়াল ব্রিজেস টু পিপল অব আদার কান্ট্রিজ’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার দুটি শাখায় প্রথম পুরস্কার ও চারটি সম্মানসূচক পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতায় তার ‘মেয়ে শিশু’ শিরোনামের ছবিটি রঙিন আলোকচিত্র বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির বার্ষিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় রঙিন আলোকচিত্রে রৌপ্যপদক পান।
আলোকচিত্রী ছাড়াও তিনি একজন জাতীয় রাইফেল শ্যুটার ছিলেন। শ্যুটার হিসেবে তিনি ৯টি জাতীয় ও ২১টি ক্লাব পুরস্কার পান। তিনি আন্তর্জাতিক শ্যুটিং ফেডারেশনের বিধি বিধান ও কলাকৌশল সম্বন্ধীয় ৪৮০ পৃষ্ঠার ইংরেজি বই বাংলায় অনুবাদ করেন। একজন শোখিন মানুষ হিসেবে ভ্রমণ করতে পছন্দ করতেন। তিনি একজন মুদ্রা সংগ্রাহক ছিলেন। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায় তার তোলা সহস্রাধিক ছবির কাটিং তিনি সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। ফটোগ্রাফিতে নিবেদিত মানুষটি শখের বশে ৩২টি দেশের আটশত পুরস্কারপ্রাপ্ত ও প্রদর্শিত ছবির কপি সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিপিএস নিউজলেটার চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত আলোকচিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘পোর্ট্রেট’ এ ফটোগ্রাফির কারিগরি দিক নিয়ে প্রায়ই প্রবন্ধ লিখতেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মোরতজা তওফিকুল ইসলাম ১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি মাসে সিলেটের আমেনা ইসলামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের পাঁচ ছেলেমেয়ে। ছেলেমেয়েরা হলেন— ফারজানা তাসনীম, ফারহানা তাহসীন, খালেদ ইবাদুল ইসলাম (লালন), তাহমীনা শারমীন ও জোহেনা তাবাসসুম।
শেষের দিকে মোরতজা তওফিকুল ইসলাম স্টুডিওতে বসতেন না। ফলে তার ছেলে লালন স্টুডিওটি পরিচালনা করতেন। স্টুডিও ব্যবসায় মন্দার কারণে ২০১৭ সালে তিনি ফটোরমা স্টুডিওর কার্যক্রম বন্ধ করে সেখানে কাপড়ের দোকান খোলেন। সারা জীবন শিশুর মতো ছিলেন মোরতজা তওফিকুল ইসলাম। শেষের দিকে তিনি আরো শিশু হয়ে যান। যাদের তিনি ভালোবাসতেন তাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে অভিমানও করতেন।
২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে তার অভিমান ভাঙাতে আসেন তার কয়েকজন আলোকচিত্রী বন্ধু ও সুহৃদ। পুরনো গল্প আলাপে জমে উঠে তাদের আড্ডা। বন্ধুদের বিদায় দিয়ে তিনি শুয়ে পড়েন। মাঝ রাতে শুরু হয় তার অস্বস্তি। ভোরবেলায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে সব শেষ।
আজ ১৩ ডিসেম্বর আলোকচিত্রী মোরতজা তওফিকুল ইসলামের পঞ্চম প্রয়াণবার্ষিকী। তার প্রতি শ্রদ্ধা।
লেখক: দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক