৪ হাজার শিক্ষার্থীকে কম্পিউটার শিখিয়েছেন দৃষ্টিহীন মামুন

প্রতিবন্ধিতা কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। এ কথা প্রমাণ করে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মেহেরপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী যুবক ওমর ফারুক মামুন। অদম্য মেধাবী মামুন গ্লুকোমায় দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জগৎকে জয় করে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। জনশক্তিকে দক্ষ করতে গড়ে তুলেছেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মামুন এখন মেহেরপুর সরকারি সমাজসেবা অফিসের কম্পিউটার প্রশিক্ষক। গত ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সেরা পুরস্কার পেয়েছেন মামুন। এ নিয়ে টানা দুবার এ পুরস্কার পেলেন তিনি।

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা মামুন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় চোখের রোগ ধরা পড়ে। পড়ুয়া মামুন বেশি পড়লে মাথা ও চোখে তীব্র যন্ত্রণা হতো। এসএসসি পরীক্ষার আগে মামুনের দুচোখ গ্লুকোমায় আক্রান্ত হয়। অর্থাভাবে ভালো চিকিৎসা জোটেনি। ২০০৬ সালে পরীক্ষার সময় হঠাৎ একদিন মামুনের দুচোখ দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু জীবনযুদ্ধে থেমে যায়নি মামুন। শ্রুতিলেখক দিয়ে পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল অর্জন করে। ইচ্ছা ছিল বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করার। কিন্তু দৃষ্টিশক্তিহীন হওয়ায় বেছে নেন কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জগৎকে। বিশেষ সফটওয়্যার ও অ্যাপসের মাধ্যমে শব্দ শুনে তিনি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট জগতে সফল হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অ্যাপসের বিশেষ শব্দের মাধ্যমে মোবাইলে কে কল করেছেন সেটাও বুঝতে পারেন। মামুন ২০০৬ সালে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কম্পিউটার প্রশিক্ষক ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে মালয়েশিয়াতে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও প্রশিক্ষণে অংশ নেন। মুজিবনগর উপজেলার কেদারগঞ্জ বাজারে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়েছেন মামুন। তার প্রশিক্ষণ পেয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার শিক্ষার্থী নানাভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে।

মামুন বলেন, ‘জন্মের কিছুদিন আগেই বাবাকে হারাই। দারিদ্র্যের মাঝে ২০০৬ সালে এসএসসি পরীক্ষার সময় গ্লুকোমা রোগে অন্ধ হয়ে যাই। কিন্তু স্বপ্ন আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। একপর্যায়ে কম্পিউটারে দক্ষতা অর্জন করলে ২০১৫ সাল থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে আছি। ২০১৬ সালে জাপান ব্রেইল লাইব্রেরি টেরিকু একিদা আইসিটি প্রোগ্রামে যাই। ২০২০ সালে করোনার সময় ঘরে বসে ‘ইজি ওয়ে টু লার্নিং কম্পিউটার’ বই লিখি। ২০২২ থেকে ফ্রি হোমিও চিকিৎসা দিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করছি।’

মামুনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী সালমা সুলতানা বলেন, ‘ভাইয়া এমনভাবে ক্লাস করে বুঝিয়ে দেন, তাতে মনেই হয় না, উনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ’

মেহেরপুর জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি বলেন, ‘মামুন এবারও জাতীয় পর্যায়ে দেশসেরা প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন। তার ইচ্ছাশক্তি ও কাজ দেখে আমরা অবাক হই। সমাজসেবা তার পাশে থাকবে।’