ছবি আঁকেন অনেকে, কিন্তু ছবি এঁকে বিবেককে জাগান ক’জন চিত্রশিল্পী? পেশাদার চিকিৎসক অনেক, কিন্তু চিকিৎসা দিয়ে সেবার মানসিকতা বিস্তৃত করেন কজন? বিদ্যালয়ে পাঠদান করেন বহু শিক্ষক, তাদের ক’জন মানুষকে প্রকৃত শিক্ষা ও গুণাবলিতে আলোকিত করেন? লেখক আছে অনেক, ক’জন লেখনী দিয়ে অচেতনের চেতন ফেরান? অনেকে নাটক-সিনেমা বানান, তাদের ক’জন নিজের কাজ দিয়ে নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার করেন সভ্যতাকে? সংগীতশিল্পী অনেকে, ক’জন ন্যায্যতার পক্ষে জয়গান গাইতে মানুষকে উজ্জীবিত করেন? সাংবাদিক অনেক, তাদের ক’জন সাহসের সঙ্গে সত্য সাধনায় ব্রত হতে উদ্বুদ্ধ করেন মানব সমাজকে? বিজ্ঞান গবেষকরা নানান কিছু উদ্ভাবন করেন, কিন্তু ক’জন বিজ্ঞানী মনুষ্যত্ব বিকাশে মানুষের চিন্তাকে পরিশীলিত করেন? বিনোদন জগতে জনপ্রিয় অনেকে, সেই তারকাদের ক’জন সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে প্রভাবিত করেন মানুষকে। চিন্তাশীল অনেকেই, তাদের ক’জন সুচিন্তায় ধাবিত করেন মানবগোষ্ঠীকে? প্রশ্নের এই তালিকা দীর্ঘ করা যায়, তবে প্রয়োজন নেই। এমন অনেক প্রশ্নের উত্তরে যাদের খুঁজে পাওয়া যায় তারা সব সমাজেই সংখ্যায় খুব কম। তারা নিজের পেশা বা কাজের পরিচয়কে ছাপিয়ে সমাজের বুদ্ধিজীবী হয়ে ওঠেন।
প্রয়াত বরেণ্য চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান আমাদের গৌরব। তার দুটো চিত্রকর্ম আমার দৃষ্টিতে, শুধু বাংলাদেশের জন্য নয় বিশ্বের বিবেককে নাড়া দেওয়ার অসামান্য ঐতিহাসিক নিদর্শন হওয়ার দাবি রাখে। যার একটি তিনি এঁকেছিলেন একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখন পাকিস্তানি শাসকরা স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের মানুষের ওপর হিংস্র আক্রমণ করে নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছিল। সেই বীভৎস নিষ্ঠুরতার সাক্ষী ছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। প্রতিবাদে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের রক্তপায়ী দানবীয় মুখের ছবি আঁকেন। সেই ছবির শিরোনাম ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে।’
পোস্টার হয় তার সেই ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম, বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিভীষিকাময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের বিবেক জাগানিয়া ছিল চিত্রকর্মটি। শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বিশ্বের বুকে বর্বরতার বিরুদ্ধে ও সভ্যতার পক্ষে একজন চিত্রশিল্পীর এমন প্রতীকী প্রতিবাদ বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে নিদর্শন হওয়া উচিত।
১৯৮৮ সালের ২ ফেব্র“য়ারি মৃত্যুর খানিক আগে শিল্পী কামরুল হাসান সমধর্মী আরেকটি চিত্রকর্ম মানবজাতিকে উপহার দিয়ে যান, যেখানে লিখে দেন ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে।’ সেই চিত্রকর্ম দিয়ে তিনি আশির দশকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবৈধ সামরিক শাসক, স্বৈরাচারখ্যাত প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ফুটিয়ে তোলেন। সেটাও পোস্টার হয়, যা দেশের মানুষের ভেতর নির্লজ্জ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জাগরণ ঘটাতে বিরল অবদান রাখে। আশির দশকেরই আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিরল ঘটনা হলো ময়না পাখিকে ব্যবহার করে কৌশলে ‘রাজাকারবিরোধী’ চেতনাকে জাগ্রত করা। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি’র জন্য নাটক বানান। তিনি একটি ধারবাহিক নাটকে ময়না পাখিকে দিয়ে বারবার ‘তুই রাজাকার’ কথাটি বলান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জন্ম ঠেকাতে স্বদেশি একদল মানুষ বেইমানি করে। তারা দখলদার পাকিস্তানি সেনাদের সাথে মিলেমিশে বাঙালিদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও লুটপাট চালিয়েছে। ময়না পাখির মুখে ‘তুই রাজাকার’ কথাটি গণমানুষের মনে গেঁথে যায় এবং রাজাকারবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে অবদান রাখে। অথচ তখন সামরিক স্বৈরাচারখ্যাত প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতায় ছিলেন। এরশাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হয়ে বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকা রাখার তথ্য দিয়েছেন স্বয়ং মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী এ, কে, এম, মোজাম্মেল হক। এছাড়াও একাত্তরে বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রাজাকার ‘মওলানা’ মান্নানকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন এরশাদ। দেশের প্রথম অবৈধ সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের পর জেনারেল এরশাদ বহু রাজাকার ও রাজাকারপন্থিদের নানাভাবে পুনর্বাসিত করেন। সে রকম ভয়ংকর বাস্তবতায়ও শিল্পী কামরুল হাসান এরশাদকে নিয়ে ব্যঙ্গ চিত্রকর্ম আঁকতে এবং হুমায়ূন আহমেদ নাটকে কৌশলে রাজাকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে অসীম সাহসিকতায় বুদ্ধিদীপ্ত বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। নিজের স্বাধীন চিন্তা, জ্ঞান-বুদ্ধি ও পান্ডিত্য দিয়ে বুদ্ধিজীবীরা স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের মঙ্গলে এবং সব অমঙ্গলের বিপক্ষে ভূমিকা রাখেন। সব সমাজেই বুদ্ধিজীবী হিসেবে গণ্য হওয়া এমন বিরল গুণের মানুষের সংখ্যা খুব কম হয়। বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও কাজের জগৎ হয় স্বাধীন। তাদের পান্ডিত্য সমাজে সব ধরনের সংকট সমাধানে পথপ্রদর্শন করে। অন্যভাবে বললে, যার যার সঠিক পথে এগুতে নিজেদের কাজ দিয়ে মানব মনে প্রভাব বিস্তার করেন তারা, হন সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্শন, আদর্শ ও নৈতিক চর্চার দিকনির্দেশক। তারা নিজেদের কাজের চর্চাকে শাণিত করে অনন্য ব্যতিক্রমী উচ্চতায় নিয়ে যান। এমন বুদ্ধিজীবীদের বৈচিত্র্যময় অবদানে একটি সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের মানুষের জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। এই সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত করতেই একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশে তাদের দালালদের নিয়ে বাঙালি বুদ্ধিজীদের হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করে।
৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি নিধনযজ্ঞ ছিল পরিকল্পিত জেনোসাইড। তারই ভেতরের আরেকটি পরিকল্পনা ছিল বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে; সেখানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ছিলেন প্রথম টার্গেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন, সাহসী, বুদ্ধিদীপ্ত গোষ্ঠী সবসময় সামরিক জান্তাদের ভয়ের কারণ ছিল। তাই তারা তাদের নির্মমভাবে হত্যার পরিকল্পনা করে। দখলদার পাকিস্তানি শাসকরা ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে বুঝতে পারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রুখতে পারবে না। তখন স্বাধীন বাঙালি জাতিকে চিন্তায়, প্রজ্ঞায়, পান্ডিত্যে পঙ্গু করার নতুন পরিকল্পনা করে। সেই অনুসারে নভেম্বরের শেষ দিকে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা শুরু করে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের একদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর বহু সুপরিচিত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়, যাদের বেশিরভাগের দেহ আর পাওয়া যায়নি। তারা ছিলেন নানান পেশার বিরল প্রাণের ব্যক্তিত্ব। ছিলেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, দার্শনিক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, আইনজীবী, শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা। এই বুদ্ধিজীবীরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেশে-বিদেশে জনমত গঠন করায় ভূমিকা রাখেন। বাঙালির লড়াইকে প্রকাশ্যে ও গোপন কৌশলে সহায়তা করেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাঙালি বুদ্ধিজীবী শহীদ হওয়ার পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজও হয়নি। তবে বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, সারা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ১ হাজার ১১১ জন। তার মধ্যে ৯৯১ জনই শিক্ষাবিদ। জেলাভিত্তিক শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা তুলনা করলে সবচেয়ে বেশি ঢাকায়, ১৪৯ জন।
শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান হত্যাকান্ডের শিকার হন মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন ঢাকার মিরপুরে, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। তিনি অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণের বিরল প্রতিভাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। একাত্তরে বর্বর দখলদার পাকিস্তানি সেনাদের বাঙালি নিধনযজ্ঞ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই নির্মাণ করেছিলেন অসামান্য প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনাসাইড’। এভাবেই যার যার পেশা ও কাজের আঙিনায় দাঁড়িয়ে একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীন, সুন্দর বাংলাদেশের জন্য নানা কৌশলে দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে কাজ করেছিলেন। দেশে অবস্থান করে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা বুদ্ধিজীবীদের অনেকে শহীদ হন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫২ বছরেও অনেক শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, প্রকাশক, কবি, উদারনৈতিক চিন্তাশীল ব্যক্তিরা হত্যার শিকার হয়েছেন। সেই তালিকায় আছেন বাংলাভাষা ও সাহিত্যের পন্ডিত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। ইসলামিক জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। একই দর্শনের হত্যাকারী গোষ্ঠী একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড ঘটায়। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী নিধনের সুপরিকল্পিত কৌশল বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পেরুনো বাংলাদেশে বজায় রেখেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। অন্যদিকে ৫২ বছরে দেশে উদারনৈতিক বিদ্যানরা বিভক্ত হয়েছেন চিন্তায় ও চর্চায়। জ্ঞানবুদ্ধির সাধকরা ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, সঠিক-বেঠিক, ন্যায্য-অন্যায্যর ভিত্তিতে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করবেন, এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু আজ বিভক্ত বিবেকের কারণে মানদ- বিভক্ত। একই ব্যক্তির কাছে কারও অন্যায় অগ্রহণযোগ্য, আবার অন্য কারও অন্যায় গ্রহণযোগ্য। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মানুষদের এমন বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বৃহত্তর সমাজকে ভুল চিন্তা, দর্শনের পথে ঠেলে দেয় এবং সাহসের সঙ্গে নীতি-নৈতিকতাপূর্ণ চর্চাকে বিভ্রান্ত ও দুর্বল করে। সেইসঙ্গে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল কাজের নামে যা হচ্ছে, সেখানে ‘লাইক’ ও ‘ভিউ’ বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা মুখ্য। সেসবকেই অনেকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মানদন্ড গণ্য করে বিভ্রান্তির জগতে ডুবে যাচ্ছে। ফলে অল্পবিদ্যায় গড়ে ওঠা আমাদের ভয়ংকর সমাজে প্রকৃত বুদ্ধিদীপ্ত ও জ্ঞান সাধনালব্ধ পান্ডিত্য চর্চার অস্তিত্ব কেবলই বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে নানা রকম বিদ্যালয় বেড়েছে, বিদ্যা নেওয়ার মানুষও বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা সংকুচিত হয়েছে। অশিক্ষার চেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে অর্ধশিক্ষা ও কুশিক্ষা। প্রকৃত জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আমাদের সমাজে কঠিনতর বাস্তবতার পাকে পড়েছে।