দলান্ধ বুদ্ধিব্যবসার চক্র

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটি জ্ঞাননির্ভর সমাজের পাটাতন নির্মিত হতে থাকে এই বঙ্গে; বিকশিত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ব্রিটিশের শৃঙ্খল মুক্তির পরে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হওয়া যে নতুন এক ঔপনিবেশিক শক্তির খপ্পরে পড়া পরাধীনতার আরেকটি রূপ তা বুঝতে এতটুকু দেরি হয়নি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির। ব্রিটিশ পূর্ব বাংলাদেশ ছিল কৃষি-শিল্প-বাণিজ্যের এক সচ্ছ্বল জনপদ। ব্রিটিশরা সম্পদ লুণ্ঠন করে বিলেতে নিয়ে যায়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে একটি কোলাবরেটর জমিদার শ্রেণি তৈরি করে। জমিদাররা পূর্ববঙ্গের সম্পদ লুট করে কলকাতায় সেকেন্ড হোম তৈরি করে। এই লুণ্ঠক জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের প্রয়োজনেই পূর্ববঙ্গের হিন্দু মুসলমান আদিবাসী সমাজ নির্বিশেষে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে পাকিস্তান আমলে। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুট করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যেতে থাকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি। পূর্ব পাকিস্তানের শক্তির জায়গা ছিল এর বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ। যে কারণে পাকিস্তানে সিন্ধি, বালুচি, পাঞ্জাবি, পশতু-ভাষীদের ওপর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া গেলেও পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষীদের ওপরে চাপিয়ে দিতে পারেনি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। ভাষা আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সক্রিয়তা যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন সূচিত কওে, তারই অস্থিধারণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বিকশিত হয়। ভাষা আন্দোলনকে বাঙালির নবজাগরণকাল বললে ভুল হবে না। শিক্ষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য-সাংবাদিকতা-চলচ্চিত্র প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎকর্ষের অনুসন্ধান করতে শুরু করে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিতা। কোনো জাতির বুদ্ধিবৃত্তির জায়গাটা বিকশিত হলে তাকে শাসন-শোষণ করা কঠিন হয়।

বাঙালির সঙ্গে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যে বৈষম্য করতে থাকে; তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছিল বুদ্ধিজীবী সমাজ। যে কারণে পাকিস্তানের অর্ধশিক্ষিত শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে আক্রোশ লালন করতে থাকে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর অসহযোগ আন্দোলনে যে ছাত্র-জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়, এর প্রণোদনা এসেছে শিক্ষকদের কাছ থেকে। ’৬৬-এর যে ছয়দফা আন্দোলনের মেনিফেস্টো তা রচনা করেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। রাজনৈতিক আন্দোলনের পেছনের যে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তাকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল পাকিস্তানি শাসকরা। তাই তো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম আঘাত এসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দার্শনিক গোবিন্দ চন্দ্র দেব নিহত হন সেই রাতে। ১৯৭১ সালে ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ নিহত হন পাকিস্তানি খুনি সেনাদের হাতে। এ ছাড়া ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী, ১৬ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী ও প্রকৌশলী নিহত হন নয় মাসের গণহত্যায়। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সেনা কর্মকর্তা রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে বুদ্ধিজীবীদের তালিকার দেখা মেলে। তালিকা প্রস্তুতিতে সহযোগিতা ও হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিল জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক গঠিত আলবদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান ঘাতক ছিল বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ধারাবাহিকভাবে এই হত্যাযজ্ঞ চললেও যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় বুঝে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার কাজটি সম্পন্ন করে পাকিস্তানি খুনি সেনারা। বাংলাদেশ বুদ্ধিবৃত্তির ওপর এই আঘাতের ফলাফল আজও দৃশ্যমান বাংলাদেশ সমাজে। মুক্তিযুদ্ধে শত্রুসেনারা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করেছিল; যাতে স্বাধীন বাংলাদেশে জ্ঞাননির্ভর সমাজ বিকশিত হতে না পারে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দ্রুত মুক্তিযুদ্ধের সুফল কুড়িয়ে নতুন বুর্জোয়া সমাজ তৈরির যে ইঁদুর দৌড় শুরু হয়; সেখানে সাম্যের সমাজের সংকল্পটি দৃঢ়ভাবে উচ্চারণের ঋজু বুদ্ধিজীবীর কণ্ঠস্বর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম যে অঙ্গীকার গণতন্ত্র তা বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টির মতো নাগরিক সমাজের নেতৃত্বের অভাব আজও ভোগাচ্ছে বাংলাদেশকে। পূর্ব পাকিস্তান সমাজে বুদ্ধিজীবীদের যে ভূমিকা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়, সেই আদর্শিক ও নিরাপস বুদ্ধিজীবিতার আর দেখা মেলেনি স্বাধীন বাংলাদেশে। বুদ্ধিজীবী সতত একটি স্বাধীন সত্তা। সে গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিজের মতো; যে সিম্পল লিভিং হাই থিংকিংয়ে বিশ্বাসী। সম্রাট আলেকজান্ডার ডায়োডিনিজের কাছে এসে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার জন্য কী করতে পারি বলুন! ডায়োজিনিজ উত্তর দিয়েছিলেন, আপনি সরে দাঁড়ালে আমি রোদটুকু পেতে পারি।

 এ রকম নিরাপস বুদ্ধিজীবী সমাজের বিকাশ পূর্ব পাকিস্তানে হয়েছিল বলেই ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষায় সাফল্য এসেছিল পাকিস্তান পর্বের শুরুতেই। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মাঝে সাম্যচিন্তার স্ফুরণ ঘটেছিল বলেই সাম্যভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন রচিত হয়েছিল। শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী রচিত ‘কবর’ নাটকটি ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে দীপিত করেছিল। শহীদ চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্র বাংলাদেশ সমাজকে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেছিল। শহীদ আলতাফ মাহমুদ প্রয়াত আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানে যে সুরারোপ করেছিলেন; তা স্বদেশ বিপ্লবের অমর এক শোকগাথা হিসেবে উদ্দীপিত করেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে। শহীদ আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ পাকিস্তানি সেনাশাসনের প্রেক্ষাপটে রচিত এক ধ্রুপদি উপন্যাস। শহীদ সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক শহীদুল্লা কায়সারের  সাম্যচিন্তার রাজনীতির সঙ্গে যে সম্পর্ক তা তার স্বদেশ চেতনাকে প্রভাবিত করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলন যেন পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির বিকাশ না ঘটায়, সে ব্যাপারে সতর্ক পরামর্শ রাখতেন তিনি তার কলামে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মাঝে অসাম্প্রদায়িকতার বোধ ছিল সহজাত। যে বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণের পক্ষে তারা আমৃত্যু কাজ করেছেন; সেই বাংলাদেশ আজও গডে ওঠেনি। ফলে পাকিস্তান ও ভারতের মতো ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঘুণপোকা রয়ে গেছে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। যে জামায়াতে ইসলামীর ঘাতকরা মুক্তিযুদ্ধে কোলাবরেটরের ভূমিকা পালন করেছে; সেই জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই। একবিংশ শতকের শুরুতে জামায়াতকে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারত্ব দিয়েছে বিএনপি। জনদাবির মুখে আওয়ামী লীগ জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিলেও, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যূথবদ্ধতায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় দেখা গেছে আওয়ামী লীগকে। ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সঙ্গে যৌথতায় আওয়ামী লীগ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নতুন প্রকল্প হাজির করেছে। ফলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন আজও অধরা রয়ে গেছে। পাকিস্তান উপনিবেশের বিরুদ্ধে লডাইয়ের কালে বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবিতার যে শক্ত মেরুদণ্ড গডে ওঠে; যেখানে বুদ্ধিজীবী চরিত্রটি নিরাপস, নৈর্ব্যক্তিক। ক্ষমতা কাঠামোর বিপরীতে গণমানুষের পক্ষে তার অবস্থান। বুদ্ধিজীবীর সেই মেরুদণ্ড স্বাধীন বাংলাদেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। পাকিস্তানি খুনি সেনাদের তালিকায় নাম ছিল; সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন এমন অল্পসংখ্যক বুদ্ধিজীবী স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র রক্ষার পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। সেনা শাসন ও ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিপক্ষে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণ-আন্দোলন করতে দেখা গেছে তাদের। বিংশ শতকের বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবিতার সোনালি যুগের অবসান ঘটে। একবিংশ শতকে বুদ্ধিজীবী শব্দটি দলীয় বিদূষক বৃত্তির প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে যেন। বিপরীত দলীয় অশুভ কাজের বিরুদ্ধে কথা বলা আর নিজ দলীয় অশুভ কাজের ব্যাপারে মুখে কুলুপ আঁটা; এ রকম এক দলান্ধ বুদ্ধিজীবিতার পাকে চক্রে বুদ্ধিজীবী শব্দটি জনস্বার্থের বিপক্ষে একদল সুবিধাবাদী মানুষ হিসেবে পরিগণিত। নতুন প্রজন্মের সামনে অনুসরণযোগ্য বুদ্ধিজীবী আইকন আর নেই বললেই চলে। দলীয় ভিত্তিতে বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ, দলীয় ভিত্তিতে সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিকদের মাঝে প্লট পদবি পদক বিতরণের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবিতা আজ মিডিওক্রেসির খপ্পরে। সুতরাং বুদ্ধিজীবী কেমন হন বা তার কেমন হওয়া উচিত সেই আইকনিক মডেল খুঁজে পেতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সুকৃতির অনুসন্ধান আজ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পডেছে। ১৪ ডিসেম্বর এলেই মিডিয়া মুখচেনা কজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানের ইন্টারভিউ করে রুটিন দায়িত্ব সম্পন্ন করে। ফলে ঢাকার বাইরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি ও সুকৃতি রয়ে যায় আলোর অলক্ষ্যে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ওপরে শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন; সে হবে বাংলাদেশ মনীষার প্রতœ গবেষণার মতো। বাংলাদেশকে আজকের এই মোহরভিত্তিক ফাঁপা সমাজ কাঠামো থেকে বেরিয়ে প্রজ্ঞানির্ভর টেকসই সমাজ কাঠামোতে প্রত্যাবর্তনের জন্য শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবনালেখ্য নতুন প্রজন্মের সামনে মেলে ধরা দরকার। একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকের প্রতীতি কেমন হয় তা জানতে বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবিতার সোনালি যুগের মানুষের স্বরূপ অনুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি।