‘নমনীয়’ কর্মসূচির চিন্তা বিএনপির

সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১১তম দফার অবরোধ কর্মসূচি শেষ করার পর নতুন করে ভাবছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, প্রথমদিকে হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি জোরালোভাবে পালিত হলেও ইদানীং কর্মসূচি তেমন জোরালোভাবে পালিত হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এমন কর্মসূচির কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় রাজপথে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির কথা ভাবছে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

বিএনপি ও সমমনা একাধিক দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন চিন্তাভাবনা জানা গেছে। তারা বলেন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ নির্বাচনের প্রচার শুরু হবে ১৮ ডিসেম্বর থেকে। ওইদিন থেকে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। আন্দোলন করা ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই।

এ নেতারা বলেন, ইসির পক্ষ থেকে নির্বাচনী প্রচার ছাড়া অন্য কোনো সভা, সমাবেশে বন্ধ চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসির এমন চাওয়া পূরণের কথা বলেছেন। এমন পদক্ষেপে সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। এটা কোনোভাবেই মানা হবে না।

আন্দোলন কর্মসূচির ধরন পাল্টানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৮ অক্টোবরের পর থেকে অবরোধ, হরতাল কর্মসূচি পালন করে আসছি আমরা। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আন্দোলনের ধরন পাল্টানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে কী কর্মসূচি আসবে এখন পর্যন্ত আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।’ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মহান বিজয় দিবসের কর্মসূচি পালনের পর সিদ্ধান্ত নেবেন বলে তিনি জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ করে বিএনপি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় কর্মসূচি পন্ড হয়ে যায়। এরপর থেকে ১১ দফায় ২৩ দিন অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন অবরোধ কর্মসূচির কারণে আন্দোলনে কিছুটা শিথিলতা এসেছে। আন্দোলন যেভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে এ অবস্থা কাটিয়ে নতুন আঙ্গিকে নতুন কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামার পরিকল্পনা চলছে। এরই অংশ হিসেবে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামার উদ্যোগ চলছে।

বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কর্মসূচি চলার কারণে আন্দোলনে কিছুটা শিথিলতা আসতে পারে। তবে শিগগিরই নতুন কর্মসূচি নিয়ে আমরা রাজপথে নামব। দলীয় ফোরামে এসব বিষয়ে আলোচনা চলছে।’

হরতাল, অবরোধের বাইরে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের অংশ হিসেবে হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে ঘেরাও, অসহযোগ আন্দোলন কর্মসূচির মতো কর্মসূচির কথা আলোচনায় থাকলেও ইদানীং এসব কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। বরং রাজপথে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে।’ তিনি জানান, এমন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ইতিমধ্যে পেশাজীবী সমাবেশ হয়েছে। খুন, গুমের শিকার নেতাকর্মীদের স্বজনদের মানববন্ধন হয়েছে। বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে মানববন্ধন হয়েছে। এভাবে সভা-সমাবেশের মতো কর্মসূচির কথা ভাবছেন তারা।

বিএনপি নেতারা বলেন, আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যেই মহান বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবস চলে এসেছে। বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৬ ডিসেম্বর রাজধানীতে বিজয় শোভাযাত্রা করে ব্যাপক জনসমাগম ঘটানোর চেষ্টা চলছে। গতকাল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী শোভাযাত্রার অনুমতি চেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয়ে (ডিএমপি) আবেদন করেছেন। ২৮ অক্টোবরের পর থেকে কার্যালয় বন্ধ। বন্ধ কার্যালয় খোলাসহ এর সামনে থেকে শোভাযাত্রা শুরুর পরিকল্পনা করছেন দলের দায়িত্বশীল নেতারা।

গত মঙ্গলবার ইসির উপসচিব মো. আতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি স্বরাাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবকে পাঠানো হয়। ইসির চিঠির বিষয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘১৮ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনী প্রচার ছাড়া কোনো প্রকার সভা-সমাবেশ না করার যে নির্দেশনা ইসি দিয়েছে, সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে।’

ইসির চিঠির কড়া সমালোচনা করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবৈধ নির্বাচন কমিশনাররা ইসিকে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনে পরিণত করেছে। তারা দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকারেও হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে আর ইসি তাতে শেষ পেরেক ঠুকতে চাচ্ছে।’