রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষার্থীদের ইন্টার্ন কোর্স ছয় মাসের। যেখানে পাঁচ মাসের ইন্টার্ন করার পর এক মাসের বিরতি দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়; যা শেষে তারা স্নাতকের ডিগ্রি পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থীরা বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ চেয়ে বিভাগের কাছে আবেদন করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ, অর্থাৎ ইন্টার্নের দুই মাসেই তাদের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অ্যাকাডেমিক কমিটি। ৬ ডিসেম্বর কমিটির জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত পরীক্ষা নিতে হলেও ইন্টার্ন শুরুর কমপক্ষে ১৪ সপ্তাহ পর পরীক্ষা নেওয়ার তারিখ দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, ইন্টার্ন একটি ব্যবহারিক বিষয়। যেখানে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা নেবেন। তারপর তাদের পরীক্ষা নিয়ে যাচাই করা হবে। কিন্তু আগেই যদি পরীক্ষা নিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে যাচাই করা হলো কীভাবে? আর পরীক্ষার পর ইন্টার্ন চালিয়ে যেতে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের আগ্রহই বা কতটুকু থাকবে। এই কোর্সে বিসিএস তো মূল পরীক্ষা না।
তবে বিভাগ বলছে, শিক্ষার্থীদের করোনাকালে সময় নষ্টের কথা বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দুই মাসে পরীক্ষা নেওয়া হলেও তাদের ছয় মাসের ইন্টার্ন শেষ করা লাগবে। এরপরই তাদের পরীক্ষার ফলাফল দেওয়া হবে। এমনকি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হয়েছে।
বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘অ্যাপিয়ার’ হিসেবে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আবেদন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৩ ডিসেম্বর বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটির নিয়মিত সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে সেই সভায় শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি কমিটি। ৬ ডিসেম্বর অ্যাকাডেমিক কমিটির জরুরি সভা আহ্বান করেন বিভাগের চেয়ারম্যান। সেই সভায় এ নিয়ে আলোচনা শেষে ইন্টার্ন শেষ না করেই এ মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়।
কারিকুলামের অংশ হিসেবে ভেটেরিনারি শিক্ষার্থীদের ছয় মাস ইন্টার্ন করতে হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে প্লেসমেন্ট করা হয়। প্রতি গ্রুপে ১৪ জন শিক্ষার্থীকে ভাগ করে বিভিন্ন জায়গায় ইন্টার্নির জন্য পাঠানো হয়। এতে তারা প্রশিক্ষকের কাছ থেকে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে সার্জারির কলাকৌশল হাতে-কলমে রপ্তের চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে ইন্টার্ন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রতি শিক্ষার্থীকে মাসে ১৫ হাজার করে টাকা দেয়; অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীকে ছয় মাসে ৯০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইন্টার্নিতে দায়িত্বরত ৪ জন শিক্ষক সম্মানী বাবদ প্রতিদিন কিছু টাকা করে ভাতা পাবেন। সব মিলিয়ে ৬ মাসে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন দায়িত্বরত শিক্ষকরা। ফলে এ ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা গরমিলের একটা বিষয়ও থেকে যায় বলে মনে করছেন অনেকে।
এ বিষয়ে নাট্যকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক মলয় ভৌমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এভাবে নিয়মের বাইরে গিয়ে চললে বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে পড়বে। আমরা তিনটি শিক্ষাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখি। যেখানে কখনোই ছাড় দেওয়া উচিত নয়। একটি চিকিৎসা শিক্ষা। যেখানে একটু ভুলেই অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে। দ্বিতীয়টি ইঞ্জিনিয়ারিং, এখানে ভুল করলে ব্রিজ, বিল্ডিং ভেঙে পড়বে। আরেকটি হলো আইন। ভুল প্রয়োগ নির্দোষকে দোষী করে ফেলবে। এটাতে কখনোই ছাড় দেওয়া উচিত হবে না। ওই বিভাগটির (ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস) ভালো পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন ছিল।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোইজুর রহমান বলেন, ‘করোনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে শিক্ষার্থীরা আবেদন করেছে যে তারা দুই বছর পিছিয়ে আছে। তাই বিসিএস পরীক্ষার জন্য অ্যাপেয়ার্ড হিসেবে আবেদন করতে চায়। এরই প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, অ্যাপেয়ার্ড হিসেবে তাদের পরীক্ষায় সুযোগ করে দেওয়ার জন্য দুই মাসে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে ইন্টার্ন ছয় মাসই থাকবে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলমগীর হোসেন সরকার বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি শুনেছি। তবে বিভাগের চেয়ারম্যান আমার কাছে এখনো আসেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তো পরীক্ষা নেওয়া ঠিক হবে না। বিসিএসকে কেন্দ্র করে শিক্ষা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা তো এক নয়।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে অফিশিয়ালি কিছু জানানো হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমরা শিক্ষার্থীদের যেমন ভালোটা দেখব, তেমনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী বৈধ হলে আমরা তাদের সুযোগ দিতে পারব। অন্যথায় আমরা আইনকে উপেক্ষা করে অবৈধ পন্থায় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।’