আরেক মেয়াদে ‘সরকারি’ বিরোধী দল

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আসনভিত্তিক সমঝোতায় পৌঁছেছে শাসকদল আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। আসন বণ্টন নিয়ে ৬ দফা বৈঠক শেষে জাপাকে ২৬টি আসন ছেড়ে দিতে সম্মত হয় ক্ষমতাসীনরা।

আজ রবিবার নির্বাচন কমিশন বরাবর আওয়ামী লীগের পাঠানো চিঠিতে আসন্ন নির্বাচনে জোটভুক্ত প্রার্থী থাকার কারণে দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহারের চিঠি দেয় আওয়ামী লীগ।

জাপা ছাড়া আওয়ামী লীগের শরীক ১৪ দলকে ৬টি আসনে ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ফলে ৭ তারিখের নির্বাচনে জাপা টানা তৃতীয় মেয়াদে সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে এটা নিশ্চিত। কেননা আওয়ামী লীগ এবং তাদের স্বতন্ত্রদের বাইরে এর চেয়ে বেশি আসন পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা আর কোনো দলের নেই।

নির্বাচনের আগে যখন সরকারি দল এবং বিরোধী দল আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচনে যায় তখন সেই নির্বাচনে মানুষের আগ্রহ কমে যায়। এভাবে যারা জয়ী হয়ে সংসদে আসেন তারা মানুষের পক্ষে কথা বলার চেয়ে নিজেদের নিয়েই বেশি  ব্যস্ত থাকেন।

বিরোধী দল যেখানে সরকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, ভুল ত্রুটি সামনে রেখে কঠোর সমালোচনা করবে এবং ভোটের মাঠে সরকারকে হটিয়ে সরকার গঠন করবে জাপা সেখানে সংসদে পুরোটা সময় কাটিয়েছে সরকারের বন্দনা গেয়ে। আর এখন নির্বাচনের আগে আনুগত্যের উপহার হিসেবে আসন পেয়েছে। বিরোধী দলের এমন আচরণ দেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য সংকট হিসেবে দেখছেন রাজনীতিবিদরা।

বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নিয়েছিল জাপা। এরমধ্যে দশম ও একাদশ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরাই জাপাকে বিরোধী দলে বসিয়েছিল এবং জাপার সংসদ সদস্যরা বিরোধী দলের আসনে বসে সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। তাদের বক্তব্য ও বাচনভঙ্গি দেখে কারা সরকারি দল এবং কারা বিরোধী দল তা বুঝতেও সমস্যায় পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী ও বিশ্লেষকদের। এবারও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল জাপা সরকারি দলের পরামর্শেই আলাদা করে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে এবং নির্বাচনের আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিরোধী দলে বসার জন্য ২৬টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সঙ্গে লড়াই করছে না। ফলে তারা বেশ কয়েকটি আসন নিয়ে বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে। চলতি সংসদের মতো এবারও দেশের জনগণ আরেক মেয়াদে ‘সরকারি’ বিরোধী দল দেখতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, জাপা যেভাবে নির্বাচনে যাচ্ছে তাতে তাদের পক্ষে সত্যিকারের বিরোধী দল হওয়া কঠিন। 

দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে জাপা যে ভূমিকা পালন করেছে তা কেবল বাংলাদেশ নয় বিশ্বের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন। এ নিয়ে জাপাকে তীব্র সমালোচনা ও অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তাদের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে অনেকেই উপহাস করে গৃহপালিত বিরোধী দল বলে ডাকা শুরু করেন। গত দুই মেয়াদে সংসদে থাকা জাপা সদস্যরা বিরোধী দল হিসেবে পরিচয় দিতে পারতেন না। ধারণা করা হচ্ছে এবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। যারা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে আসনভিত্তিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধী দলে বসবে তারা সরকারের সমালোচনা করা ও জনগণের পক্ষে কথা বলার মতো নৈতিক অবস্থানে থাকেন না।

বিরোধী দলে জাপার ভূমিকা নিয়ে চলতি বছরের মে মাসে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তিনি বলেছিলেন, জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করে। অনেকেই আমাদের গৃহপালিত বিরোধী দল বলে ডাকেন, যা শুনতে ভালো লাগে না। জাতীয় পার্টি আর কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হবে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় ইতিমধ্যে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। নির্বাচনের আগে সংসদে থাকা সরকারি  দল এবং বিরোধী দল আসন ভাগাভাগি করে সমঝোতার মাধ্যমে যে নির্বাচনে যাচ্ছে একে তো সুষ্ঠু নির্বাচন বলাই যায় না বরং এই নির্বাচন হবে পাতানো। নির্বাচন হলো গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে প্রথম পদক্ষেপ। এখন পাতানো নির্বাচন দিয়ে যদি আমরা যাত্রাপথ শুরু করি তাহলে গণতান্ত্রিক পথ বন্ধুর হবে, সংকটময় হবে এবং আমাদের জন্য সামনে আরও কঠিন কিছু অপেক্ষা করছে। এর ফলে বস্তুত আমাদের দেশটাই খাদে পড়ে যেতে পারে। আর এই নির্বাচনের ফলে আমাদের গণতন্ত্র হয়ে যাবে বানরের পিঠা ভাগের গণতন্ত্র।

জাপার প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, এটা তো অস্বীকার করা যাবে না যে এই ভোটটা পরিপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনে যারা অংশ নিচ্ছে বিভিন্ন সময় তাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্যতা ছিল বা আছে। যেহেতু সখ্যতাসম্পন্ন দলগুলো ভোটে অংশ নিচ্ছে এবং সখ্যতা নেই এমন দলগুলো নির্বাচন বর্জন করছে ফলে স্বাভাবিকভাবে যারা অংশ নিচ্ছে নির্বাচনে তারা আলোচনার মাধ্যমেই একটা পথ বের করবে।