হেভিওয়েট স্বতন্ত্রদের প্রায় সবার ঈগল

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান। কিন্ত নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় তাকে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে লড়াই করবেন।

আজ সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার মো. শফিউর রহমান তার কার্যালয়ের সভা কক্ষে ডা. মুরাদকে ঈগল প্রতীক বরাদ্দ দেন। মুরাদ হাসানের মতো এবার ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। কিন্ত আওয়ামী লীগ তার আসনে মনোনয়ন দেয় দলের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো চেয়ারম্যান কাজী জাফরুল্লাহকে। একাদশ নির্বাচনে নিক্সন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নৌকার জাফরুল্লাহকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। মুরাদের মতো এবার তিনিও ঈগল প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন।

কেবল মুরাদ কিংবা নিক্সন নয় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন এমন সব হেভিওয়েট প্রার্থীদের প্রতীক হিসেবে একটাই চাওয়া ছিল ঈগল। বিভিন্ন জায়গায় ঈগল প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে রীতিমতো লড়াই হয়েছে। কোনোভাবে মীমাংসা করতে না পেরে লটারির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

আওয়ামী লীগের বড় নেতা হিসেবে পরিচিত কিংবা আলোচিত নেতাদের ঈগল প্রতীক বরাদ্দ পেতে যে লড়াই চালিয়েছেন তা নিয়ে রাজনীতিতে নানা কানাঘুষা ও গুঞ্জন চলছে। অনেকেই মনে করছেন বিএনপির মতো বড় দল এবারের নির্বাচনে না থাকায় আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র নেতারা এবার জাতীয় পার্টির চেয়ে বেশি আসনে জিততে যাচ্ছেন। নানা নাটকীয়তা শেষে গতকাল রবিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৬ আসনে সমঝোতা করে ২৮৩টি আসনে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক ক্ষমতা ও প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা তলানিতে থাকায় এবার আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্রদের কাছে জাপার বেশীরভাগ প্রার্থীরা ধরাশায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফলে জাতীয় পার্টির থেকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা যদি নির্বাচনে বেশি আসনে জিতে তাহলে সংসদের বিরোধী দলে বসে কী না তা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। এ গুঞ্জন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ঈগল প্রতীক চাওয়া আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নামের তালিকা ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক হিসেবে ঈগল নিয়ে কাড়াকাড়ি। কুমিল্লায় ১১টি আসনে ৮৮ প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার খন্দকার মু মুশফিকুর রহমান। এসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে ব্যাপক হট্টগোল হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক হিসেবে সবার একটাই চাওয়া ছিল ঈগল।

হঠাৎ ঈগল নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাড়াকাড়ি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাকেও অবাক করেছে। কৌতূহল মেটাতে আমার এলাকার এক স্বতন্ত্র প্রার্থীকে প্রশ্ন করি এত প্রতীক থাকতে ঈগল-ই কেন লাগবে? জবাবে সেই প্রার্থী বলেন, নির্বাচন কমিশন যে কয়টি প্রতীক বরাদ্দ দিচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও ভোটারদের কাছে আকর্ষণীয় প্রতীক হচ্ছে ঈগল।’

স্বতন্ত্রদের নিয়ে বিরোধী দল গঠনের গুঞ্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে খাওয়রুজ্জামান লিটন বলেন, লজিক্যালি এটা সম্ভব নয়। এরকম কোনো পরিকল্পনাও আওয়ামী লীগের নেই। আমার মনে হয় ঈগলের মধ্যে একটা শক্তির ব্যাপার আছে আর ব্যালটে যেহেতু ঈগল বেশি স্পষ্ট তাই সবাই প্রতীক হিসেবে এটা চাইছে।

তবে খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে একমত নয় সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন হচ্ছে কৌশলের খেলা। এবারের নির্বাচনে সবকিছু আগে থেকে নির্ধারিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তারপরও বাস্তবিক অর্থেই জাতীয় পার্টির যে সক্ষমতা তাতে তারা খুব বেশি আসনে জিততে পারবে না। স্বতন্ত্ররা যদি জাপা থেকে বেশি আসন পায় তাহলে তারা সবাই মিলে একটি জোট গঠন করে কিংবা অন্য কোনো দলের সঙ্গে মিলে সংসদের বিরোধী দলে বসলেও আমি অবাক হব না। এই ধারণা আরও বাড়ছে ঈগল নিয়ে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের টানাটানি।’

কুমিল্লায় ১১টি আসনে ৮৮ প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে ব্যাপক হট্টগোল হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের  প্রতীক হিসেবে সবার একটাই চাওয়া ছিল ঈগল। কুমিল্লা-৫ বুড়িচং ব্রাহ্মণপাড়া আসনের সাজ্জাদ হোসেন, আবু জাহের ও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা শওকত মাহমুদ ঈগল প্রতীকের আবেদন করেন। শওকত মাহমুদকে ঈগল প্রতীক বরাদ্দ দেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু জাহের ও সাজ্জাদ হোসেন আপত্তি জানান। এ নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদ চলে এ দুই প্রার্থীর।

একই অবস্থা কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনেরও। প্রতীক বরাদ্দের সময় এই আসনে ঈগল প্রতীক নিতে রুবেল পারভেজ নামের এক স্বতন্ত্র প্রার্থী ইচ্ছা পোষণ করেন। এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান আরও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মুসতানজিদের ও ইফতেখার মাহমুদ। দুজনই কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ। তিনজনই একই প্রতীক চেয়ে বসায় রিটার্নিং কর্মকর্তা তাদের সমন্বয় করতে বলেন। কিন্ত তারা কেউ ঈগল ছাড়তে রাজি হননি। ফলে নিয়ম অনুযায়ী লটারি করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক এহেতেশাম রেজা। লটারিতে রুবেল পারভেজ ঈগল প্রতীক পান। এ সময় তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বরগুনার দুটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ বিভিন্ন দলের মোট ১৭ জন প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে। এ সময় বরগুনা-১ (সদর, আমতলী, তালতলী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দুইজন ঈগল প্রতীকে নির্বাচন করতে চাইলে লটারির মাধ্যমে তাদের প্রতীক নির্ধারণ করা হয়।

প্রতীক পছন্দের বিষয়ে ডা. মুরাদ হাসান বলেন, ‘ঈগল মার্কা আমার সাথে যায়, এই কারণেই পছন্দ। আর কি মার্কা আছে, না আছে সেটা আমার দেখারও নাই। অন্য মার্কা নিয়ে মন্তব্যও নেই, কথাও নাই।’

রাজশাহী-(গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ওবায়দুর রহমান জানান, ঈগল প্রতীক তিনি চেয়েছিলেন, সেটিই পেয়েছেন। এটি চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ওবায়দুর জানান, জনগণ এই প্রতীক চেয়েছিল। জনগণের চাওয়ার গুরুত্ব দিয়ে তিনি এই প্রতীক চেয়েছিলেন। 

আলোচিত ব্যবসায়ী এ কে আজাদ নৌকার মনোনয়ন না পেয়ে ফরিদপুর-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এ কে আজাদও প্রতীক হিসেবে ঈগল চান এবং বরাদ্দও পান। ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর। আলোচিত এই প্রার্থীর বিপরীতে এবার স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং তিনিও ঈগল প্রতীক পেয়েছেন।

হবিগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি কেয়া চৌধুরী পেয়ছেন ঈগল প্রতীক। হবিগঞ্জ-২ আসনে বর্তমান এমপি আব্দুল মজিদ খান দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়বেন। একইভাবে হবিগঞ্জ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনও পেয়েছেন ঈগল প্রতীক। একইভাবে টাঙ্গাইলের ৮টি আসনের ৬টি আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্ররা ঈগল প্রতীক পেয়েছেন।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈগল নিয়ে যে কাড়াকাড়ি প্রার্থীদের মধ্যে চলছে এটা কিন্ত একইসঙ্গে ইন্টারেস্টিং এবং সন্দেহজনক। আইনত স্বতন্ত্রদের জোটবদ্ধ হয়ে বিরোধীদল হতে বাধা নেই। তারা যদি সরকারী দলের পর অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি আসন পান এবং একটি জোট তৈরি করে যেকোনো একটি দলের সঙ্গে সমঝোতা করে সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসতে চান তারা তা করতে পারবেন।