বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান গন্তব্য পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের উত্থান-পতনের মধ্যেও অপ্রচলিত বাজারগুলোতে আশার আলো বাড়ছে; বিশেষ করে পূর্ব দিকের রাষ্ট্র জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রতি মাসেই বাড়ছে। চীনেও বাংলাদেশের বাজার বাড়ছে। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে রাশিয়ায় বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। আশার কথা হলো, রাশিয়ায়ও রপ্তানি আয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।
তবে হতাশার চিত্র দেখা দিয়েছে পাশের দেশ ভারতে রপ্তানি আয় কমার চিত্রে। একটু পেছনে ফেরা যাক। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাশের দেশ ভারতে ২১৩ কোটি (২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা; যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই ভারতের বাজারে পণ্য রপ্তানি থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়নি। এরই মধ্যে ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য শুরু হয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শুরুতেই, ১১ জুলাই থেকে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত এই লেনদেন। সবাই আশা করেছিলেন ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য শুরু হলে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশটিতে রপ্তানি আয় আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু তা না বেড়ে উল্টো কমছে।
তবে অন্য অপ্রচলিত (নতুন) বাজারে আশার আলো দেখাচ্ছে। জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেশ বেড়েছে। এমনকি যুদ্ধের কারণে নানা বাধার মধ্যেও রাশিয়ায় রপ্তানি বাড়ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বুধবার রপ্তানি আয়ের দেশভিত্তিক যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে, অর্থাৎ জুলাই-নভেম্বর সময়ে ভারতের বাজারে ৮২ কোটি ৬৪ লাখ ২০ হাজার ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ কম।
২০২২-২৩ অর্থবছরের এই পাঁচ মাসে ভারতে পণ্য রপ্তানি থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন (৯৬ কোটি ৭৯ লাখ) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ; যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০২১-২২) চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ভারতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৪৭ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এই হিসাবে এই পাঁচ মাসে ভারতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারতে পণ্য রপ্তানি থেকে ১৯৯ কোটি ১৪ লাখ (১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন) ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছিল।
কয়েক বছর ধরেই ভারতে রপ্তানি বাড়ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো দেশটিতে পণ্য রপ্তানি আয় ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। পাঁচ বছরের মাথায় গত অর্থবছরে সেই আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে মাত্র চারটি অর্থবছরে ভারতে পণ্য রপ্তানি ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের বেশি হয়েছে, তাও সেটা গত চার বছরে। তার আগের বছরগুলোয় ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে।
২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা ভারতের বাজারে ১২৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ১০৯ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে নেমে আসে।
২০১১ সালে ভারত বাংলাদেশকে অস্ত্র ও মাদক বাদে সব পণ্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা দেয়। যদিও সেই সুবিধা খুব বেশি কাজে লাগাতে পারছিলেন না বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা।
২০১১ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের বেশ কিছু কারখানার কাছ থেকে পোশাক নিয়ে টাকা দেয়নি ভারতীয় কোম্পানি লিলিপুট। সে জন্য বেশ কয়েক বছর পোশাক রপ্তানিতে ভাটা পড়ে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন শহরে পোশাকের নামিদামি বিদেশি অনেক ব্র্যান্ড বিক্রয়কেন্দ্র খোলায় তাতে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পায়।
তৈরি পোশাক ছাড়া ভারতে অন্য যে সব পণ্য রপ্তানি হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পাট ও পাটজাতপণ্য, কটন ও কটন প্রোডাক্টস, প্লাস্টিক দ্রব্যাদি এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ভারতে ৯ কোটি ৬০ লাখ ১০ হাজার ডলারের পাট ও পাটজাতপণ্য, ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার ডলারের কটন ও কটন প্রোডাক্টস, ১ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলারের প্লাস্টিক দ্রব্যাদি এবং ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
অন্য অপ্রচলিত বাজারে বাড়ছে
ভারতে রপ্তানি কমলেও এই পাঁচ মাসে জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্কসহ অন্য অপ্রচলিত বাজারে বেড়েছে। পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেশ বেড়েছে।
জুলাই-নভেম্বর সময়ে জাপানে প্রায় ৮০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে; যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ বেশি। চীনে রপ্তানি হয়েছে ৩৫ কোটি ডলারের পণ্য; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। রাশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে ১৮ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য; বেড়েছে ৩২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ ছাড়া এই পাঁচ মাসে অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তুরস্কে বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।
বড় বাজারের প্রায় সব দেশেই কমেছে
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র; জুলাই-নভেম্বর সময়ে এই বাজারে রপ্তানি আয় কমেছে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। জার্মানিতে কমেছে ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। কানাডায় কমেছে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে যুক্তরাজ্যে ১৪ শতাংশ ও স্পেনে ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে।