চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি আসনে যে দলের প্রার্থী জিতে যায় ওই দলই সরকার গঠন করে এমন একটি কথা চালু আছে চট্টগ্রামে। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফল এই কথার সত্যতাও প্রমাণ করে। গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে এবার নেই ভোটের আমেজ।
আসনটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তার বিরুদ্ধে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন ৬ জন, যারা নামসর্বস্ব বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। যে কারণে পুরোপুরি নির্ভার নৌকার প্রার্থী ও তার সমর্থকরা। মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রের এই আসনটিতে রয়েছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম আদালত ভবন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ, জেনারেল পোস্ট অফিস, নিউ মার্কেট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ভবন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দেশে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার চাক্তাই খাতুনগঞ্জ।
এর আগে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হয়েছেন বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান, আওয়ামী লীগের এম এ মন্নান ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েও টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম বিএসসি।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আলোচিত এই আসন থেকে নৌকার মনোনয়ন চেয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু গতবারের মতো এবারও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান ও বর্তমান শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর ওপরই আস্থা রেখেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে দলীয় মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ওই নির্বাচনের সময় তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেন ছিলেন কারাবন্দি। কারাগারে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৭ হাজার ৬২৪ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। আর আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহিবুল হাসান চৌধুরী পেয়েছিলেন ২ লাখ ২৩ হাজার ৬১৪ ভোট।
এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রামের অধিকাংশ আসনে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মোকাবিলা করতে গিয়ে নৌকার প্রার্থীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে চট্টগ্রাম-৯ আসনে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই।
এ আসনের অন্য ৬ প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির সানজিদ রশিদ চৌধুরী, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মো. ওয়াহিদ মুরাদ (চেয়ার), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মিটল দাশ গুপ্ত (কুঁড়েঘর), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের আবু আজম (মোমবাতি), তৃণমূল বিএনপির সুজিত সরকার (সোনালি আঁশ) ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মো. নুরুল হুসাইন (হাতঘড়ি)।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে নির্ভার থাকলেও নির্বাচনের মাঠে ভোটের আমেজ সৃষ্টি করাই নৌকার প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার দিন থেকেই কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। প্রতিদিন নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ করে যাচ্ছেন তিনি। যে পথেই যাচ্ছেন নৌকার স্লোগানে মুখরিত হচ্ছে সেই এলাকা।
নির্বাচনী প্রচার শুরুর প্রাক্কালে মহিবুল হাসান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ আসনে সাতজন প্রার্থী রয়েছেন। সুতরাং নির্ভার বলা যাবে না। আমাদের অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীও আছে। সেই অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে আমরা পরাজিত করতে চাই। ভোটাররা যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সেজন্য আমরা কাজ করছি।’
গত মঙ্গলবার মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ন্যাপের মিটল দাশ গুপ্তকে দেখা যায় সেই অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় সারিতে বসে থাকতে।
জানতে চাইলে মিটল দাশ গুপ্ত এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি নির্বাচনী প্রচারে ছিলাম। জামালখানে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলে তিনি তার সঙ্গে আসতে বলেন। তাই এখানে এসেছি।’ এ সময় তার উপস্থিতি নিয়ে অনেকের তির্যক মন্তব্যও শোনা যায়। বাকলিয়া এলাকায় নিয়মিত চেয়ার প্রতীক নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী মো. ওয়াহেদ মুরাদ। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও এ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। তার বাবা কফিল উদ্দিন ১৯৭৩ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এলাকার সন্তান হিসেবে মানুষ আমাকে নির্বাচিত করবেন এ প্রত্যাশা নিয়েই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।’
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এম আর আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ আসনে নৌকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো প্রার্থী নেই। যারা আছে তারাও ভোটারদের কাছে পরিচিত নয়। তাই সবার মাঝে একটু ঢিলেঢালা ভাব রয়েছে।’
জাতীয় সংসদের ২৮৬ নম্বর আসন চট্টগ্রাম-৯। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাগমনিরাম, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়া, পূর্ব বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দেওয়ান বাজার, জামালখান, এনায়েত বাজার, উত্তর পাঠানটুলি, আলকরণ, আন্দরকিল্লা, ফিরিঙ্গিবাজার, পাথরঘাটা ও বকশিরহাট ওয়ার্ড নিয়ে এ আসনটি গঠিত। এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৩৪ জন।