দুর্ঘটনা বা যাত্রাপথে যানবাহনের চালক ও হেলপারের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার ঘটনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে নতুন কিছু নয়। মহাসড়কে বিভিন্ন ব্যানারে চলাচলকারী বাস, লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও হেলপারদের সঙ্গে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় যান আটক করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। জরিমানা আদায় করে ছাত্রলীগ। কিন্তু অপ্রীতিকর ঘটনা বন্ধ হয় না। গত ৯ মাসে অন্তত ১০ বার এমন ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন বাসের চালক এবং হেলপাররা হাফ ভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাত্রী হেনস্তা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া এবং চাপা দিয়ে হত্যা করার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনার জের ধরে মূলত ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সহপাঠীরা বাসগুলো আটক করেন। আর এই সুযোগ নেন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নেতারা। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ নেতারা এসব সমস্যা সমাধানের নামে বাস মালিকদের কাছ থেকে অধিকাংশ সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায় করে থাকেন।
শিক্ষার্থীরা বাস আটক করার পর যদি ছাত্রলীগ নেতাদের মাধ্যমে সমাধান করতে হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব ক্ষেত্রে কী ভূমিকা পালন করে– এমন প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, শিক্ষার্থীরা বাসে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানান না। আবার যেসব যানবাহন শিক্ষার্থীরা আটক করেন তাদের কর্তৃপক্ষও সমাধানের জন্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। তাই তারা সমাধান করতে পারেন না।
গত ৬ ডিসেম্বর সেলফি বাসের ধাক্কায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ৪১তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত মো. রুবেল পারভেজ নিহত হলে পরদিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সেলফি পরিবহনের ২৫টি বাস আটক করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। পরে ১০টি বাস ছেড়ে দিয়ে বাকি ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আটকে রেখে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। এর চার দিন পর সেলফি পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে নিহতের পরিবারকে আট লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিলে বাসগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রশাসন-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যানুযায়ী, ‘বাস আটকের পর যদি শিক্ষার্থী ও বাস কর্তৃপক্ষের কোনো একটি পক্ষ প্রশাসনকে জানায়, তাহলে রুবেল পারভেজের ঘটনার মতো প্রশাসন উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটা সুষ্ঠু সমাধান করতে পারে। কিন্তু কেউ প্রশাসনকে না জানিয়ে নিজেরা টাকা নিয়ে বা অন্য উপায়ে সমাধান করেন। ফলে কিছুদিন পরপর এমন ঘটনা ঘটতে দেখা যায়।
গত ৯ থেকে ১৪ অক্টোবর পাঁচ দিনে তিনবার বাস আটকের ঘটনা ঘটে। তিন দিনেই টাকা আদায় করে বাস ছাড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে বাসে হেনস্তার অভিযোগে লাব্বাইক পরিবহনের সাতটি বাস আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের একদল শিক্ষার্থী। পরে ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়ে তারা বাসগুলো ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
এর দুদিন আগে অর্থাৎ ১২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক কর্মী গাবতলী থেকে বাসে উঠতে গেলে তাকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগে সেলফি পরিবহনের ২০টি বাস আটক করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ওইদিন দুপুরে বাস-মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ওরফে লিটনসহ কয়েকজন নেতা। পরে তাদের থেকে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে বেলা ২টার দিকে বাসগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়।
তার আগে ৯ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের প্রথম বর্ষের এক ছাত্র এবং তার বান্ধবীর সঙ্গে বাসে হাফ ভাড়া নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ছাত্রী মাথায় আঘাত পান বলে দাবি ওই ছাত্রীর। এ ঘটনার জেরে সাভার পরিবহনের ১৮টি বাস আটক করে ওই হলের একদল শিক্ষার্থী। পরে হলের ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা ৩০ হাজার টাকা আদায় করে বাসগুলো ছেড়ে দেন। তবে ওই টাকা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী পাননি।
গত ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক উবাইদুর রহমান সিদ্দিকীর গাড়িতে একটি অ্যাম্বুলেন্স ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় তিনি তার বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের কর্মীদের দিয়ে সেটি তিন দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে রাখেন। পরে নিজের গাড়িটি মেরামত করতে ৭০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেন ওই অধ্যাপক। তবে অ্যাম্বুলেন্স কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যেটুকু ক্ষতি হয়েছে সেটুকু মেরামত করতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হতো না। কিন্তু ওই অধ্যাপক পুরো যন্ত্রাংশ নতুন লাগিয়ে নেন।’
এর আগে ২৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা সাভার-আশুলিয়া রুটে চলাচলকারী ২৪টি লেগুনা আটকে রাখেন। তখন লেগুনার চালক ও মালিকপক্ষ অভিযোগ করে বলেন, প্রতিদিন প্রতিটি লেগুনা থেকে ২৫ টাকা করে চাঁদা দেওয়া হতো ছাত্রলীগকে। এই রুটে প্রতিদিন ২০০টি লেগুনা চলাচল করে। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, এখন থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা দেওয়ার জন্য। চাঁদা আদায়ের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় লেগুনাগুলো আটকে রাখা হয়। আর ছাত্রলীগ নেতাদের অভিযোগ ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা লেগুনাগুলো আটক করেন। তিন দিন পর ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে লেগুনার মালিকরা আলোচনায় বসেন। পরে লেগুনাগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়।
গত ১৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগে সাভার পরিবহনের আটটি বাস আটক করেন মীর মশাররফ হোসেন হলের শিক্ষার্থীরা। ভুক্তভোগী রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এবং পুলিশ আলোচনায় বসে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা নেয় বলে জানা গেছে।
গত ৬ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতাকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগে ঢাকা থেকে শেরপুরগামী এমডি সুপার নামে একটি বাস ভাঙচুর করে ক্যাম্পাসে ছয় দিন আটকে রাখেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। পরে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তারা। তবে সে সময় বাস মালিকের অভিযোগ ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মুরশিদ আকন্দ রুট পারমিট না পাওয়ায় একটি নতুন বাস রাস্তায় নামাতে পারেননি। তাই ক্ষোভ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দিয়ে এমডি সুপারের বাসটি ভাঙচুর করে আটকে রাখেন।
সর্বশেষ গত ১৩ ডিসেম্বর রাজধানী পরিবহন এবং ১৫ ডিসেম্বর ঠিকানা পরিবহনের বাস আটক করেন শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনকে কিছু না জানিয়ে নিজেরাই সমাধান করে বাসগুলো ছেড়ে দেয় বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান।
ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের একাংশের সভাপতি অমর্ত্য রায় বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাস কর্তৃপক্ষের সম্পর্কটা এক ধরনের রেষারেষির। এজন্য অঘটন ঘটলে শিক্ষার্থীরা বাস আটকান। বাস আটকানোর পর যারা শিক্ষার্থী হিসেবে বেশি ক্ষমতাবান তারা ঝামেলার সুযোগ নিয়ে টাকা দাবি করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে টাকাটা যায় ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের হাতে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারির প্রয়োজন।’
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বাস আটক করে টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি আক্তারুজ্জামান সোহেল ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটনকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাসের চালক ও হেলপারদের ঝামেলা হয় হাফ ভাড়া নিয়ে। হেলপাররা খারাপ ব্যবহার করেন। পরে শিক্ষার্থীরা বাস আটকে রাখেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুনি টাকা নিয়ে ছেড়ে দেন। কিন্তু এটা কোনো সমাধান না। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বা বাস কর্তৃপক্ষ প্রশাসনকে কিছুই জানায় না। ফলে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারে না। কোনো একটি পক্ষ প্রশাসনকে জানালে আমরা একটা সুষ্ঠু সমাধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারি।’
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড নূরুল আলমকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি।