৩ বছরে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ

বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। তিন বছরে বেড়েছে দ্বিগুণ। আর ১৪ বছরে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ গুণ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে পিডিবির খরচ হতো গড়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা। সেই ব্যয় এখন ১২ টাকার কাছাকাছি। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভুলনীতি, অযাচিত ব্যয় আর নানা অসংগতির পাশাপাশি কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসানও বাড়ছে। সেই লোকসান সামাল দিতে দফায় দফায় গ্রাহকপর্যায়ে বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম।

তবে পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দাবি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য জিনিসের মতো বিদ্যুতের দামও বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণেই মূলত বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকহারে বেড়ে গেছে। উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য সরকারের তরফ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল, টিডিএসসহ অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিলে গড় উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে।

পিডিবির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশীয় এবং আমদানি করা বিদ্যুৎ মিলে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ১১ টাকা ৮৬ পয়সা। যদিও এই ব্যয় ১০ টাকা ৯০ পয়সা হতে পারে বলে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রক্ষেপণ করেছিল পিডিবি। কিন্তু বাস্তবে প্রক্ষেপণের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। এর আগের অর্থবছরে (২০২১-২২) ইউনিটপ্রতি গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল ৮ টাকা ৮১ পয়সা। অন্যদিকে ২০২০-২১ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৬ টাকা ৬১ ও ৫ টাকা ৯১ পয়সা।

বর্তমানে পিডিবি প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ১০ পয়সা দরে পাইকারি বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে তা বিক্রির কারণে পিডিবির লোকসান বাড়ছে। লোকসান সামাল দিতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে কয়েকটি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ২ টাকা ৫৮ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ৯৫ পয়সা। এর পরের অর্থবছরে আরও বেড়ে ৫ টাকা ৩৬ পয়সা হয়। এরপর গড় উৎপাদন ব্যয় বাড়তে বাড়তে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গিয়ে ৬ টাকা ৩৩ পয়সা হয়। পরের দুই অর্থবছর (২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০) উৎপাদন ব্যয় আগের চেয়ে কমে যথাক্রমে ৬ টাকা এবং ৫ টাকা ৯১ পয়সায় দাঁড়ায়। এরপর থেকে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়তে থাকে অস্বাভাবিক হারে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক ভালো বিকল্প থাকলেও সরকার সে পথে না গিয়ে আর্থিক ঘাটতির দোহাই দিয়ে দাম বৃদ্ধি করছে। এতে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকও ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা গেলে কম দামে জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার ও তাদের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতার সঙ্গে থাকা মানুষকারোরই এ ব্যাপারে আগ্রহ নেই। ফলে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম অবিরাম বাড়তেই থাকবে।’

বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় ১৪ বছরে গ্রাহকপর্যায়ে অন্তত ১৩ বার এবং পাইকারি পর্যায়ে ১০ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ,জ্বালানি খাতে ধীরে ধীরে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় গণশুনানি ছাড়াই চলতি বছর তিন দফায় খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম মোট ১৫ ও পাইকারিতে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে সরকারের নির্বাহী আদেশে। বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে চলতি অর্থবছর তুলনামূলক লোকসান কিছুটা কমবে। তবে পুরোপুরি লোকসান থেকে বের হতে বিদ্যুতের দাম আরও অন্তত ৬৫ শতাংশ বাড়াতে হবে পিডিবিকে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় না করে বারবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করতে চাইছে। কিন্তু এ জন্য যে বিপুল পরিমাণ টাকা দরকার তা সমন্বয় করে গ্যাস-বিদ্যুতের যে দাম হবে তা সোনার চেয়েও দামি হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। এতে ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের ভর্তুকি বাড়ছে। অথচ জনগণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। এটি বিদ্যুৎ খাতের ভয়ংকর “ডিজাস্টার”।’

বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদের সাড়ে ১৪ বছরে বেসরকারি খাতের ১০৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ভাড়া বাবদ পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। এর বাইরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যও টাকা পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরেই কেন্দ্রভাড়া দিতে হয়েছিল ১৮ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকার কিছু বেশি। চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রভাড়া বেড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে কর্মকর্তারা প্রক্ষেপণ করেছেন। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। ফলে বেশিরভাগ সময় অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, চুক্তি অনুসারে এসব কেন্দ্রকে কেন্দ্রভাড়া দেওয়া হয়, যাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বলা হয়।

শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতের সব কোম্পানির বোর্ড থেকে অদক্ষ আমলাদের সরিয়ে দক্ষ, স্বচ্ছ চিন্তা-চেতনা, দেশপ্রেম এবং কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পদায়ন করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা না থাকলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। সুতরাং এ খাতকে ব্যবসায়ী খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে উন্নয়ন হয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের বেশি বেশি মুনাফা দেওয়ার জন্য বিশেষ আইন করা হয়েছে, তা খুবই বাজে কাজ হয়েছে। সরকারের এই নীতি ও দর্শন বদলাতে হবে।’