যুক্তরাজ্যে রপ্তানির জন্য ক্রিসমাস কার্ডিগান বা জাম্পার তৈরিকারী রুবি দৈনন্দিন খরচের চাপে পেশাদার যৌনকর্মীর খাতায় নাম জড়াতে হয়েছে। অথচ তিনি টেসকো, মাতালান এবং নেক্সট-সহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ করেন। রুবি তার ছোট্ট ঘরের ঠাণ্ডা, শক্ত মেঝেতে শুয়ে ছটফট করেন এ দুশ্চিন্তায় যে, শীত ও মন্দার চলমান দুর্বিপাকে তার পরিবার টিকে থাকবে কীভাবে। রিলিফ হিসেবে পাওয়া একটা বড় কম্বলের নিচে রুবির পাশে কুঁকড়ে থাকে তার ১৩ বছর বয়সী কন্যা মায়া।
দুই সন্তানের মা রুবি সন্তানদের ঘুমিয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করেন। এরপর একটি শাল জড়িয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জের বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ঘেঁষা বাজারে খদ্দেরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। রুবির ভাষ্যমতে, ‘পুরুষরা জানে আমরা কী চাই, রাতে এভাবে রাস্তায় কেন দাঁড়াতে হয়।’ দারিদ্র্য, মজুরির দুষ্টচক্র, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটে রুবির মতো আরও অনেক গার্মেন্টস শ্রমিককে অবমাননাকর ভিন্ন পেশা বেছে নিতে বাধ্য করছে।
রুবির পরিস্থিতি আগে এতটা খারাপ ছিল না; প্রথমে তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে নিজের খাবার বাঁচিয়ে মায়ার জন্য নিয়ে আসতেন। তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় এখন তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে সাকিব ক্ষুধায় চুরি করতে শুরু করে। এমতাবস্থায় তিনি বাড়ি ভাড়া ও বিল মেটাতে গিয়ে ক্ষুদ্রঋণের আশ্রয় নেন, এখন এ ঋণ পরিশোধের সংগ্রামও তাকে করতে হচ্ছে। গত বছর থেকে তার অবস্থা ক্রমাগত শোচনীয় হচ্ছে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে সচল রাখা চার মিলিয়ন শ্রমিকের একজন রুবি। উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনো বিশ্বের সর্বনিম্ন মজুরি প্রদান করা হয়। নভেম্বর মাসে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজধানী জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে সরকার মাসে ১২,৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে। যেখানে শ্রমিকরা দাবি করছেন, অন্তত ২৩,০০০ টাকার নিচে মৌলিক জীবনযাত্রার খরচ মেটানো ও পরিবারের আহার জোগানো অসম্ভব। সপ্তাহে সাত দিন ১০ ঘণ্টা শিফটে কাজ করা সত্ত্বেও রুবির সাপ্তাহিক উপার্জন মাত্র ২০০০ টাকা। যা তার হাতে তৈরি হওয়া হাজারো ক্রিসমাস পোশাকের একটার খুচরা মূল্যের চেয়েও কম। ডিসেম্বরে নতুন ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হবে বলে আশা করা হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
রুবির গল্পে ফিরে যাই। মাস কয়েক আগে এক লোক তাকে ৫০০ টাকার লোভ দেখায় যা রুবির মনে দ্বিগুণ উপার্জনের আনন্দ এনে দেয়। রুবির ভাষায়, ‘আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে পারব ভেবে মেনে নিয়েছিলাম। টাকাটার নিরাপত্তাজনিত কারণে গাড়িতে ওঠার আগেই আমি কাছের দোকানদারের কাছে রেখে দিই। কিন্তু যখন লোকটির বাড়িতে পৌঁছাই, গিয়ে দেখি আরও ১০ জন আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে চলে আসতে চাইলে তারা সব দরজা বন্ধ করে দেয়। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। আমি কাঁদতে শুরু করি। তারপর যে লোকটি আমাকে সেখানে নিয়ে এসেছিল সে আমাকে তার টাকা ফেরত দিয়ে চলে যেতে বলে। কিন্তু আমি টাকাটা দোকানে রেখে এসেছিলাম। লোকটি আমার সারা গায়ে টাকা খুঁজতে থাকে। কিছুই খুঁজে না পেয়ে সে আমাকে বেদম মারতে শুরু করে। আমাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে টেবিলের ওপর ফেলে আমার মুখ থেঁতলে দেয় এবং আমাকে বাইরে ছুড়ে ফেলে। আমি রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় শুয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মরে যাব। ভাবছিলাম আমি মারা গেলে আমার সন্তানদের কী হবে। আমার মেয়েও আমার মতো নিঃশেষ হবে? এর চেয়ে খারাপ কিছু আসলে কল্পনাও করতে পারি না।’
আহত হওয়া সত্ত্বেও দৈনন্দিন ও মাসিক খরচা মেটাতে রুবির সামনে আর রাস্তা নেই। রুবির ভাষ্যমতে, ‘সবকিছুর দামে আগুন এমনকি ডিম কিনতে পারাটাও এখন বিলাসিতা। নতুন জামা-কাপড়ের কথা ভুলে গেছি। গত পাঁচ বছর ধরে এই একই শীত পোশাক পরে আসছি। সুন্দর হলুদ শীতজামাটি এখন কাদার মতো বাদামি হয়ে গেছে।’ প্রতিদিন ফ্যাক্টরিতে কাজের পর রুবি অপেক্ষা করেন কোনো ওভারটাইম শিফট পাওয়া যায় কিনা এ আশায়। কিন্তু সবসময় পাওয়া যায় না। রুবি বলেন, ‘সুতরাং আমি খদ্দের খুঁজতে বাজারের দিকে চলে যাই।’ রুবি সাধারণত প্রতি খদ্দেরের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নেন এবং দিনে দুই বা তিনজনের বিছানায় যান। (সরকারের নির্ধারিত নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় মাত্র ৬৫ টাকা।) তিনি এ টাকায় খাবার কেনেন। তিনি কারখানা থেকে যা আয় করেন তার বেশিরভাগই খরচ হয়ে যায় ভাড়া, বিল এবং তার সন্তানদের পড়ালেখার জন্য।
আমার বাড়ি ফিরতে সাধারণত মধ্যরাত হয়ে যায় এবং আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্ত বোধ করি। জানি না শরীর আর কতটা নিতে পারবে। আমি শুধু আমার সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় বেঁচে আছি। আমার মেয়ে মায়া ডাক্তার হতে চায়। সে এমন কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখে, যা আমি কল্পনাও করতে পারি না। একজন মা হিসেবে আমার একমাত্র আসল কাজ হলো সেই স্বপ্নগুলোর অন্তত সামান্য অংশ হলেও সত্যি করে তোলার চেষ্টা করা।’ প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে রুবি কিছু কাঠ সংগ্রহ করেন এবং আগুন জ্বালিয়ে তার হাত গরম করেন। মাঝে মাঝে চুপচাপ নিজের সঙ্গে গুনগুন করেন। ভাবেন, তার বানানো কার্ডিগানগুলো যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছে কি না।
লেখক : পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক নারী, সংঘাত ও মানবাধিকার ফোকাস দা গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি