সুশাসনের অনুপস্থিতি দিন দিন প্রখরতর হচ্ছে

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। আমরা ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তে। বছরের শেষ প্রান্তে এসে সরকার, সুশাসন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্নে দেশের অবস্থা নিয়ে আগামী বছর সামনে রেখে তিনি বিস্তারিত কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : আগামী বছরের শুরুতেই ভোট। ফলে ২০২৩ সাল জুড়েই রাজনীতি ও নির্বাচন ছিল মনোযোগের কেন্দ্রে। নির্বাচনী বছরে সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমে কিছুটা মনোযোগ কম থাকে বা কেন্দ্র থাকে না। তারপরও সার্বিক বিচারে বছর শেষে সুশাসন, বিচার, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী রকম?

আলী ইমাম মজুমদার : মূল্যায়নের কথা বলতে গেলে প্রথমে যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে আসি, দেখা যাবে মূল্যস্ফীতির জন্য মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত শ্রেণি বড় ধরনের চাপে ছিল এবং আছে। এটা মোটামুটি লম্বা সময় ধরে, প্রায় দেড়-দুই বছরে ধরে। আর এটা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, কমার কোনো লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। জীবনযাত্রার মান অনেক বেড়ে গেছে এবং এর সঙ্গে তাল সামলাতে পারছে না। এটার প্রভাব পড়ছে সমাজের সর্বস্তরেই। অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা সামান্য ৫% বাড়লেও, বেসরকারি খাতে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সেটাও হয়নি। পাশাপাশি নির্বাচন বিষয়টি রয়েছে। আবার সুশাসনের কথা যেটা বললেন সেটা হলো আমাদের দেশে সুশাসনের অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন থেকে বিরাজ করছে এবং এটা দিন দিন প্রখর থেকে প্রখরতর হচ্ছে। বিশেষ করে যারা শক্তিমান তারা অন্যায় করলেও পার পেয়ে যাচ্ছেন এবং যারা তুলনামূলকভাবে দুর্বল- আর্থিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, তারা সবলদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। দেশে দুর্নীতি হচ্ছে; যারা দুর্নীতিপরায়ণ, তারা অনেকটা বেপরোয়া হয়েই দুর্নীতি করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সামনের সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় ২০০০-এর মতো লোক মনোনয়নপত্র দাখিলের হলফনামাগুলোতে তাদের যে সম্পদ ও আয়ের বিবরণী দিয়েছেন সেটা আমদের সমাজের স্বাভাবিক আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না। বিশেষ করে যদি আগের দুই টার্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে এটা বিরাট পার্থক্য। এত কম সময়ের মধ্যে এই পরিমাণ সম্পদের বৃদ্ধি হওয়ার কথা না। এটা হয়তো সব ক্ষেত্রেই না, তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে। তারা হলফনামাটা যে দিলেন, সেটা আবার নির্বাচন কমিশন তো এত কম সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই করতে পারে না এবং তাদের বিধিবদ্ধ কাজের মধ্যেও পড়ে না। এগুলো দেখার জন্য রাষ্ট্রের যে অন্য সংস্থাগুলো আছে, যেমন দুর্নীতি দমন কমিশন বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে আমরা আরও হতাশ হচ্ছি।

দেশ রূপান্তর : বিচার ব্যবস্থার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের বিষয়টি অনেক দিন থেকেই আলোচনায়। সুশাসন প্রশ্নেও অংশীজনের অবজারভেশন আছে। নির্বাচনী বছরে কি এটা আরও বেড়েছে?

আলী ইমাম মজুমদার : হ্যাঁ, বেড়েছে। নির্বাচনী বছরে এটি আসলে বেড়েছে, বিশেষ করে ক্ষমতায় থাকা দল বা ব্যক্তি যারা আছেন, তাদের সমর্থন নিয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু বিরুদ্ধ মতের প্রতি কঠোর প্রয়োগে পিছপা হননি। অন্যদিকে যারা এটা সমর্থন করেননি, তাদের প্রতি আইনটা আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই হচ্ছে। আদালতে দিনের পর দিন ঘুরছেন, মামলা, বিচার দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে যে শুধু আদালত দায়ী তা না, এর সঙ্গে বাদীপক্ষ, সরকারের পক্ষে মামলাকারী, পুলিশ, তাদের পক্ষ থেকে যে পাবলিক প্রসিকিউটর থাকেন সবাই। এ ক্ষেত্রে শৈথিল্য আছে এবং এই মামলাগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। কেউ বাদী হচ্ছেন বিচার পাচ্ছেন না আবার কেউ আসামি হিসেবে দিনের পর দিন ভুগছেন।

দেশ রূপান্তর : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খাদিজার ব্যাপারটা সারা দেশে আলোচনায় ছিল। তিনি প্রায় এক বছর জেলে বন্দি থাকলেন। কারও কারও জামিন পাওয়া মাত্রই রাতের ভেতরেই কারামুক্তির ব্যবস্থা করা হয় আর সেই ক্ষেত্রে তার জামিনের আদেশ পৌঁছাতে তিন দিন লাগল। ব্যাপারগুলো কীভাবে দেখছেন?

আলী ইমাম মজুমদার : এখানে আদালতের বিষয় সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করব না। আদালত কাকে জামিন দেবে, কাকে দেবে না এটা আদালতের এখতিয়ারাধীন বিষয়। আদালত বিবেচনা করেছে জামিন দিয়েছে, বিবেচনা করেছে জামিন দেয়নি। কিন্তু তারা আদেশ করার পর তাদের হুকুমনামাটা সংশ্লিষ্ট জায়গায় সময়মতো না পৌঁছানো বা দেরিতে পৌঁছানো আবার কারোটা ম্যাজিক গতিতে পৌঁছানো এটা প্রশাসনিকভাবে হচ্ছে। এ রকম হওয়াটা অনুচিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।

দেশ রূপান্তর : বছর জুড়ে আলোচনা ছিল মার্কিন ভিসানীতি। আইনশৃঙ্খলা, সিভিল, বিচার বিভাগসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরে এর কি প্রভাব দেখতে পেরেছেন?

আলী ইমাম মজুমদার : প্রথম কথা হলো, ভিসানীতি আমাদের দেশের জন্য বা একটা শক্তিশালী দেশের জন্য বেদনাদায়ক হলেও এই জিনিসটা আমরাই টেনে এনেছি। তারা একটা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড, বিশেষ করে মানবাধিকার প্রশ্নে। তারা নিজেরা এটা মেইনটেইন করে এবং চায় যে অন্যরাও সেটা মেইনটেইন করুক। আমরা সেই স্ট্যান্ডার্ডের অনেক নিচের লেভেলে আছি। তারা বারবার এটা নিয়ে অনেক কথা বলেছে এবং পরে তারা এই নীতি চালু করেছে। এটা আসলে আমাদের জন্য আনন্দদায়ক বা খুশির সংবাদ না, আমরা ব্যথিত কিন্তু আসলে আমরাই এটাকে টেনে এনেছি। যেমন র‌্যাবের কথাই ধরেন। র‌্যাবকে নিয়ে আমরা গৌরব বোধ করি, এটা অত্যন্ত পারদর্শী একটা সংস্থা। বিশেষ করে যখন এ দেশের জঙ্গিদের তৎপরতা বেড়ে গিয়েছিল, তখন র‌্যাব অনেক পারদর্শিতার সঙ্গে তা দমন করেছে। তাদের গোয়েন্দা পদ্ধতিও খুবই এফিসিয়েন্ট। সেই র‌্যাবকে আমরা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলাম না। তারা বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবাধিকার পরিপন্থী কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ল। আমরা তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারিনি। যার ফলে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এলো। আমি ব্যথিত, আমি চাই এই প্রতিষ্ঠানটি আগের জায়গায় ফিরে যাক। আমার কথা হচ্ছে, ধরেন আমি খারাপ কাজ করতে থাকি এবং কেউ যদি চড় দেওয়ার পর বন্ধ করি সেটা আমার জন্য কোনো ক্রেডিট না। আমার উচিত ছিল নিজে থেকে বন্ধ করা। আসলে এই বিষয়টা নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো অনেক আগে থেকেই বলে আসছিল। আমিই আমার বিভিন্ন লেখার মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে বলেছি, এ রকম কাজ করা ঠিক না। তবে এটা বন্ধ হয়নি এবং চলছিল। আপাতত যে ক্রসফায়ার বন্ধ হয়েছে এটা একটা স্বস্তির ব্যাপার। কিন্তু এই স্বস্তিটা আমরা পেলাম অন্যদের জোরালো ধাক্কার জন্য। আমরা নিজেরা কিন্তু এ ব্যাপারটা করতে পারিনি। এটা আমাদের রাষ্ট্রতন্ত্রের ব্যর্থতা। যারা রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এস্টাবলিস্ট করতে পারেনি বা চায়নি। ফলে যারা শক্তিমান তারা এই সংস্থাগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, যার জন্য এটা হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন সবকিছুই রাজনীতিকরণের একটা অভিযোগ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কাঠামোর মধ্যে আছে আর কতটা দলীয় হয়ে পড়েছে?

আলী ইমাম মজুমদার : প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে পুরোপুরি নেই কিন্তু পুরোটার রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে, এমনটাও আমি বলব না। কারণ আমি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মকর্তাকে চিনি, যারা এই ব্যবস্থাটা পছন্দ করছেন না। কিন্তু পরিস্থিতিটা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যারা এটাকে পছন্দ করছেন না, তারাও কিন্তু এই রাজনীতিকরণের চক্রের মধ্যে পড়ে গেছেন। এটা থেকে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা পোষণ করা হয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি থাকে তাহলে এটা থেকে প্রত্যাবর্তন সম্ভব। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের পাশাপাশি প্রশাসন, পুলিশের অনেক এফিসিয়েন্ট কর্মকর্তা স্বাধীনভাবে, নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে চান। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তারা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং শক্তিমানদের পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছেন। যেটা অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এখান থেকে প্রত্যাবর্তনের রাস্তা নেই বলে আমি মনে করি।

দেশ রূপান্তর : সরকার যখন ডলার সংকটে কৃচ্ছ্র সাধনের কথা বলছে, সেই সময় আমরা দেখলাম নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই ইউএনওরা গাড়ি চেয়ে বসলেন। বেতন বৃদ্ধির ঘটনা তো রয়েছেই। এসব সুবিধা নিয়ে প্রশাসন দায়িত্বের প্রতি কতটা এফিসিয়েন্ট থাকতে পারবে?

আলী ইমাম মজুমদার : এখানে ব্যাপারটা বুঝতে হবে, প্রথমত আমার যেটা মনে হয় ইউএনওরা গাড়ির জন্য অথরাইজড। আর আগের গাড়ি থেকে নতুন গাড়ি দিতে হলে নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। যেমন গাড়ির একটা লাইফ আছে, লাইফ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নিয়ম আছে এবং সেই নিয়মপালন করা ছাড়া গাড়ি হস্তান্তর হতে পারে না। আর শতভাগ গাড়ি নতুন দেওয়া হয়নি, কিছু পরিমাণ গাড়ি দেওয়া হয়েছে। কিছু গাড়ির লাইফ আমি যতটুকু জানি শেষ হয়ে গিয়েছিল। যদি কোনোটা লাইফ শেষ হওয়ার আগেই এমনি দিয়ে থাকে সেটা ঠিক হয়নি। আর নির্বাচন সামনে রেখে গাড়ির তো প্রয়োজন ছিল। কারণ এখন তো তারা দৌড়াদৌড়ি করছেন। এখানে কৃচ্ছ্রের ব্যাপার ছিল, কিন্তু নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রের ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। নির্বাচন করতে হলে টাকা খরচ করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সংস্থা যারা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবে, তাদের এফিসিয়েন্ট রাখতে হলে তাদের ইকুইপমেন্টও দিতে হবে। নিশ্চয়ই ভালো গাড়ি পেলে তারা খুশি হবে, ব্যাপারটা রিলেটিভ এবং তুলনামূলক। তবে এখানে যদি তারা প্রাপ্যতার মধ্যে থাকে এবং তাদের আগের গাড়ির লাইফ শেষ হলে যদি রিপ্লেস করা হয়ে থাকে, তবে আমার মনে হয় এটা অন্যায় করা হয়নি, ঠিকই হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : যদি সাধারণ মানুষের আয়ের কথা চিন্তা করেন, তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকার বাড়িয়েছে সেটা স্বাভাবিক মনে হয়? বেসরকারি খাতে তো বেতন বাড়ছে না, এতে কি বৈষম্য বাড়ছে না?

সরকার কর্মকর্তাদের তুষ্ট করে চলতে চাচ্ছে এমন মনোভাব প্রকাশ পায় কি না?

আলী ইমাম মজুমদার : আজকে জিনিসটা এভাবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের বলা হচ্ছে যে পার ক্যাপিটা ইনকাম আমাদের পাশের দেশ ভারতের চেয়ে বেশি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একজন সচিব বেতন পান ২ লাখ ২৫ হাজার রুপি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব বেতন পান ২ লাখ ৫০ হাজার রুপি। আর বাংলাদেশের একজন সচিব বেতন পান ৭৪ হাজার টাকা। এটা বেতন বাড়ানোর পরে। আমি রিটায়ার্ড করেছি ২৪ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে। এখানে এটা বেসিক আর ভারতেও ওই বেতনটা বেসিক। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা আমাদের দুর্ভাগ্যজনক হবে। ভারতে নিম্নতর সরকারি কর্মচারী যারা আছেন, তারা আমাদের নিম্নতর সরকারি কর্মচারীদের থেকেও বেশি বেতন পান। প্রকৃতপক্ষে বেতন-ভাতা পার ক্যাপিটা ইনকাম যেটা দেখানো হয়, সেটা যদি ভারতের সঙ্গে তুলনা করি ইনকাম ইন ইকুয়ালিটি অনেক বেশি। এখানে সর্বস্তরের অর্থাৎ উঁচু এবং সর্বনিম্ন স্তরের কর্মচারীকেও ধরা হয়।

দিনে দুই ডলার কমে যদি কারও ইনকাম হয়, তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এটা কীভাবে স্ট্যান্ডার্ড, সেটি আমি বলতে পারব না। একটি পরিবারের সদস্য সাধারণত পাঁচজন হয়ে থাকে, আমাদের দেশে তাই ধরা হয়। তাহলে দিনে ১০ ডলার ইনকাম থাকা দরকার। অর্থাৎ ১০ ডলার মানে দিনে ১০০০ বা ১১০০ টাকা ইনকাম থাকা দরকার, মাসে ৩৩ হাজার টাকা তার থাকা দরকার। সরকারি কর্মকর্তার বিরাট একটি অংশ কিন্তু ৩৩ হাজার টাকার কম বেতন পান, নিচের দিকে যারা আছেন। অর্থাৎ সরকারের হিসাব অনুসারে তারা বর্তমান দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছেন। সরকারি চাকরি করে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবেন, এটি নিশ্চয়ই প্রত্যাশিত না। আর যেখানে আপনাকে দেখানো হচ্ছে আমাদের উপার্জন ২০০০-এর ওপরে, বর্তমানে আমরা পাশের দেশ ভারত থেকে বেশি। তো সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন আমার মনে হয় আরও বাড়ানো উচিত। বেসরকারি খাতগুলো বাড়াতে পারছে না, বাড়াচ্ছে না, তারা কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে সুবিচারের পরিচয় দিচ্ছে না। এর আগে গার্মেন্টসের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হয়েছে ব্যাপারটা জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হচ্ছে। আপনার ভারতে বেতন কত? ভারত একই মার্কেটে মার্কেটিং করে। চীনে বেতন কত? ভিয়েতনামে বেতন কত? আরও গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং যে দেশগুলো আছে, প্রত্যেকের বেতন আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিকদের চেয়ে বেশি। তারাও তো একই মার্কেটে কাজ করছেন, তাহলে আমাদের এখানে বেতন কম হবে কেন?

দেশ রূপান্তর : সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও ট্রেনিংয়ে বিদেশ যাওয়া বেশ আলোচনায় ছিল। খিচুড়ি রান্না, পুকুর কাটা শিখতেও বিদেশ যাওয়ার খবর এসেছে। এসব নিয়ে কি বলবেন?

আলী ইমাম মজুমদার : এসব মুখরোচক কথা। খিচুড়ি রান্না কথাটা কীভাবে বলা হয়? স্কুলের মিড ডে মিল দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্কুলে এটি এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি, হয়তো কিছু স্কুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে মিড ডে মিলটা ভারতে কীভাবে অর্গানাইজ করছে, কে রান্না করছে, কীভাবে রান্না হচ্ছে এটি দেখতে যদি শিক্ষক বা কর্মকর্তারা পাশের দেশের পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরা সফর করেন, তাহলে এটি খুব ব্যয়বহুল একটি ব্যাপার হবে না? এখানে খিচুড়ি রান্নার ব্যাপারটা খুব মুখরোচকভাবে প্রচারিত করা হয়েছে। আমার মনে হয় বিদেশ সফর, ক্ষেত্রবিশেষে আজকের বিশ্বে এটিকে গ্লোবালাইজ করা হয়েছে। বিদেশ থেকে আমাদের বহু টেকনোলজি ধার করার ব্যাপার আছে, বিনা কারণে যাওয়া উচিত না। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক সময় খুব তুচ্ছ কারণেও যায়, এটা সমর্থনযোগ্য না। কিন্তু বেশিরভাগ ফরেইন ট্যুরগুলো কিন্তু হচ্ছে আমাদের দেশের ফরেইন এইডের মাধ্যমে। হয়তোবা দাতা সংস্থাগুলো ইচ্ছে করেই দেয় যে তাদের দেশের টাকাটা খরচ হবে। তা সত্ত্বেও আমি আপনার সঙ্গে একমত যে তুচ্ছ কারণে বিদেশ সফর যেন না করতে পারে সেই ব্যবস্থা সরকারের করা উচিত।

দেশ রূপান্তর : দেখা গেছে, বিজ্ঞানভিত্তিক বা বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওই ক্ষেত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া একজন কর্মকর্তাকে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা কীভাবে দেখেন?

আলী ইমাম মজুমদার : আমি মনে করি, একজন ব্যক্তিকে যেখানে পদায়ন করা হবে, সেই দায়িত্ব পরিচালনা করার মতো তাকে কম্পিটেন্ট হতে হবে। যোগ্য না হলে তাকে সে জায়গায় দেওয়া ঠিক না, এখানে কোনো ডিসিপ্লিন থেকে আসছেন, শুধু এটা দিয়েই তার উপযুক্ততা বোঝায় না। আমি যেটা মনে করি, সে যে ডিসিপ্লিন থেকেই আসুক, সে যদি কম্পিটেন্ট বা উপযুক্ত না হয়, এই দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে সেখানে পদায়ন করা উচিত না।

দেশ রূপান্তর : সিভিল সার্ভিস এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাজীবী সংগঠন আছে। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস ও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। এসব সংগঠন অনেক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখায়। এমনও দেখা গেছে, শাস্তিমূলকভাবে কোনো কর্মকর্তাকে ক্লোজ করা হলে, তাদের প্রতিক্রিয়ায় সেটা প্রত্যাহার করা হয়। এতে কি সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পায় না?

আলী ইমাম মজুমদার : পেশাগত সংগঠনগুলো তাদের বিভিন্ন সমস্যা সরকারের কাছে তুলে ধরবে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার, মানে রাজনৈতিক কর্র্তৃপক্ষ। তুলে ধরার অধিকার সবার আছে। এই সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের এই ক্ষতি হবে, আমাদের দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হবে। আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো তো রাজনৈতিক কর্র্তৃপক্ষ দিচ্ছে, এজন্য তো দেশ অচল হয়ে যায়নি, চলছে তো। প্রত্যাহারের বিষয়টিও তো সরকারের সিদ্ধান্তে করা হয়েছে।

আমাদের দেশে তাও কম প্রতিক্রিয়া দেখছেন, কোনো কোনো দেশে এর চেয়েও বেশি উদাহরণ আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এসব আইনসম্মত হতে হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্র্তৃত্ব কিন্তু রাজনৈতিক কর্র্তৃপক্ষের এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারাই নেয়। সুতরাং এখানে প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো অর্থাৎ কোনো একটা কাজ দেওয়া হলো প্রশাসনকে বা সমিতির পক্ষ থেকে যদি বলা হয় যে এটা করলে এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাই কাজটা করা যাবে না। তাহলে কিন্তু সরকার এটার পুনর্বিবেচনা করতে পারে, সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বা আংশিক পরিবর্তনও করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : অভিযুক্তদের নিয়ে পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে অপরাধের বর্ণনা দেয়। কিন্তু অভিযুক্ত নির্দোষ হতে পারে। উন্নত বিশ্বে এ ধরনের অপরাধীর মুখও দেখানো হয় না আগেই। এই যে মিডিয়া ট্রায়ালের যে ব্যাপার এটা তো পুলিশের কাছ থেকেই শুরু হয় বলে মনে হয়। আপনার মতামত কী?

আলী ইমাম মজুমদার : এটা একদমই অনুচিত। পুলিশ গ্রেপ্তার করার বা তাদের আওতায় আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে হাজির করার নিয়ম আছে। এর মধ্যে পুলিশ তার কাছে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে। কথিত অপরাধীকে এভাবে পাবলিকলি দেখানো সঠিক না বলে আমার মনে হয়।

দেশ রূপান্তর : প্রশাসন এবং পুলিশের অনেক কর্মকর্তাকে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন, দিচ্ছেন এবং এটা দিন দিন বাড়ছে। নির্বাচনী বছরে এটা আমাদের প্রশাসন এবং পুলিশকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে?

আলী ইমাম মজুমদার : সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি আছে। আমি মনে করি এটা ক্ষেত্রবিশেষে হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক নেওয়া হয়েছে। আর যেগুলো হয়নি সে ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আপনি যে ব্যাপকভাবে বলছেন এমন কিছু আসলে ব্যাপকভাবে হয়েছে বলে মনে করি না। দেশে যে চারটা স্ট্যান্ডার্ড ইলেকশন ধরা হয় সেগুলো কিন্তু এই প্রশাসনই করেছে।

দেশ রূপান্তর : সামনের বছরের শুরুতে নির্বাচন, আমরা নির্বাচনী বছর পার করছি। সার্বিকভাবে আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে?

আলী ইমাম মজুমদার : বেশ কিছুু ক্ষেত্রে হতাশাজনক চিত্র আছে, তবে সব ক্ষেত্রে নয়। বিশেষ করে আমি আর্থিক দিকটা নিয়ে শঙ্কিত। ডলারের দাম ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং টাকার দামে নিম্নগতি। এটা আমাদের জন্য খুব ক্ষতিকর হচ্ছে, এটাকে যদি বিপরীতমুখী না করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ আরও কষ্ট করতে থাকবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, জনপ্রশাসন বলেন, পুলিশ বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানই বলেন তারা যদি পেশাগত দায়িত্বে অধিকতর মনোযোগী না হয়, তাহলে দেশের শাসনব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব আসবে। নির্বাচন কমিশনের কথা ধরেন, সামনে যে নির্বাচন রয়েছে, সে নির্বাচন সামনে রেখে যে কমিশন আসছে, তারা আমাদের প্রত্যাশা অনুসারে অগ্রসর হতে পারেনি। কমিশন তাদের নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে সঠিক পরিচয় দিতে পারেনি বলে যে অভিযোগ আছে, তা বেশ কিছু ক্ষেত্রে সত্য। তারা যদি তাদের দায়িত্ব পালনে সঠিক হতো, তাহলে সবার অংশগ্রহণে উৎসবমুখর নির্বাচন দেখতে পারতাম। নির্বাচন তো উৎসবমুখর হয়ইনি, বরং পানসে, কোনো নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা দেখিই না, খুবই কম দেখি। তবে, আমি সব সময়ই আশাবাদী মানুষ। মানুষ কিন্তু ঘুরে দাঁড়ায়। ব্যক্তি মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ, কিন্তু জাতি দীর্ঘদিনের। আমরা সংকট কাটিয়ে উঠব, আমাদের জেনারেশন না পারলে ভবিষ্যৎ জেনারেশন কাটিয়ে উঠবে।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হক হৃদয়