দুই প্রার্থীর প্রেস্টিজ ইস্যু, তুমুল আলোচনায় ফরিদপুর-৩

আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটের মাঠে দুজনই নবাগত। এর আগে কোনো নির্বাচনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা নেই কারোই। একজন আওয়ামী লীগের প্রতীক নিয়ে, অন্যজন স্বতন্ত্র। তারা দুজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও ভোটের মাঠে এসে এখন তারা একে অপরের শত্রু।

ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে শামীম হক। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও। অপরদিকে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ। তিনি লড়ছেন ঈগল প্রতীক নিয়ে।

নির্বাচনের মাঠে শামীম হক ও এ কে আজাদ ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন জেলার রাজনীতিতে। ক্ষমতাসীন দলটির বেশির ভাগ নেতাই দুভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনের মাঠে প্রচারণায় নেমেছেন। নৌকার প্রার্থী শামীম হক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদ প্রেস্টিজ ইস্যু হিসাবে নিয়েছেন এ নির্বাচন। জেলার অন্য আসনগুলো থেকে সদর আসনটিতে প্রচার-প্রচারণা বেশ জমে উঠেছে। চলছে দুই প্রার্থী ও সমর্থকদের কথার যুদ্ধ। কথার যুদ্ধে কেউ কাউকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ। ফলে এ আসনে কথার লড়াইয়ের পাশাপাশি চলছে নেতাকর্মীদের সঙ্গে পাবার লড়াইও। আসন্ন ভোটযুদ্ধে নতুন করে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। ক্যাম্প ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, কর্মী-সমর্থকদের মারপিট করা নিয়েও থানায় প্রতিদিনই হচ্ছে একাধিক অভিযোগ। ফলে ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই এ আসনে বাড়ছে উত্তাপ।

ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম), বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রাথী। এ ৬ প্রার্থীর মধ্যে কেবলমাত্র আলোচনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামীম হক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদ। বাকি প্রার্থীদের কোনো প্রচার-প্রচারণা চোখে পড়েনি। আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দুজনই প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যাপক  প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। দুই প্রার্থীই তাদের নেতাকর্মীদের মাঠে নামিয়েছেন ভোট প্রার্থনায়- সাধারণ ভোটারদের কাছে।

একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে ভোটযুদ্ধ হচ্ছে আওয়ামী লীগের সাথে সতন্ত্র আওয়ামী লীগের। নির্বাচনে যেই জিতুন না কেন, ভোটের ব্যবধান হবে খুবই সামান্যই। যিনি ভোটারদের মন জয় করতে পারবেন তিনিই হবেন এ আসনের সংসদ সদস্য- এমনটাই ধারণা তাদের। আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামীম হক দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়েই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর শেখ হাসিনার নির্দেশে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। গত বছর তাকে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পর থেকেই তিনি জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একজন জনপ্রিয় নেতা হিসাবে অবির্ভূত হন। শুধু তাই নয়, তিনি একটি এতিমখানা পরিচালনার পাশাপশি বিনামূল্যে সার্জারি ক্যাম্প, চক্ষু ক্যাম্প, নদী ভাঙা মানুষের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন কাজে তিনি অকাতরে দান করে উপাধি পেয়েছেন দানবীর হিসাবে। এলাকার উন্নয়নে তিনি বেশ প্রশংসিত। বিশেষ করে খেলাধূলার প্রতি তার বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। তিনি একাধারে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ রাসেল ও আবহানী ক্লাবের সভাপতি দায়িত্বে রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামীম হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ফরিদপুর-৩ আসনের ভোটরেরা নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকেই ভোট দেবেন। তিনি বলেন, আমার প্রতিপক্ষ যিনি রয়েছেন তিনিও আওয়ামী লীগ করেন। কিন্তু তিনি শেখ হাসিনার বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। প্রার্থী হবার পর তিনি ইসিতে আমার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকের অভিযোগ এনে প্রার্থিতা বাতিল করেছেন। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আদালত থেকে আমি আমার প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছি। তিনি ফের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের রায়ের বিরোধিতা করে রিভিউ করেছেন। এসব করে নৌকার ভোট কমানো যাবে না। তিনি এখন ভোটের মাঠে সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছেন। নির্বাচন বানচাল করতে তিনি বিএনপির নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ দিয়ে চলেছেন। শেষ পর্যন্ত তার এ মিশন সফল হবে না।

এদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বিগত দিনে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এবার তিনি উপদেষ্টা সদস্য হিসাবে রয়েছেন। একজন দানবীর হিসাবে এ কে আজাদের পরিচিতি। ফরিদপুরের বহু মানুষকে তিনি তার কারখানায় চাকরি দিয়েছেন।

এ কে আজাদ বলেন, আমি ফরিদপুরের মানুষের সেবা করতে চাই। তাই এবারের নির্বাচনে আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। আমি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নই। আমি জননেত্রী শেখ হাসিনার একজন সৈনিক এবং নেত্রীর নির্দেশেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। আমি নির্বাচিত হলে ফরিদপুরে একটি ইকোনমিক জোন গড়ে তুলব। তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে নৌকার প্রার্থীর পক্ষ থেকে।

সব জলপনা-কল্পনা শেষে আগামী ৭ তারিখ ভোটের দিন ঠিক হবে কে হবেন আলোচিত ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য। তবে সাধারণ ভোটারদের দাবি- যে-ই নির্বাচিত হোক তিনি যেন ফরিদপুরের উন্নয়নে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখেন।