রাজনৈতিক সংকটে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট কেটে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং তা আরও গভীর ও দীর্ঘ হচ্ছে। অর্থনীতির অনেকগুলো সূচকই আরও দুর্বল হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-সংকট আরও বেড়েছে। খাদ্য-সংকটের আশঙ্কা বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়েই। সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন মূল্যস্ফীতি। এতে জীবনযাপনের খরচ বেড়ে গেছে, কমেছে প্রকৃত আয়। উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। উৎপাদন কম হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো হিমশিম খাচ্ছে ডলার নিয়ে। সরকারের আয়ও কম। ফলে ভর্তুকির বরাদ্দও বাড়াতে পারছে না। বিশ্ব অর্থনীতি নিয়েও ভালো কোনো পূর্বাভাস নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগ্রাসীভাবে গত বছরেই ছয়বার নীতি সুদের হার বাড়িয়েছে। তারপরও মূল্যস্ফীতি তেমন কমছে না। বরং এর ফলে বিশ্বমন্দার আশঙ্কা আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, খারাপ সময় আসা এখনো আরও বাকি। বিশ্বে সামনে প্রবৃদ্ধি আরও কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। অর্থনীতির সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে, বিভক্ত রাজনীতির এই বিশ্ব এখন ভবিষ্যতের কথা না ভেবে স্বল্পকালীন পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এতে মানুষের জীবন আরও খারাপ অবস্থায় চলে যাচ্ছে, দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের মহা হুমকি। তাদের বিবেচনায় অর্থনীতির সামনের মহা হুমকি হচ্ছে, একই সঙ্গে মন্দা ও মূল্যস্ফীতির উপস্থিতি এবং সরকারি ও বেসরকারি ঋণ পরিশোধের দায়ের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।

সাম্প্রতিক অর্থনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে ২০২৩ বর্ষপঞ্জিটি। আগামী দিনের বিশ্লেষকরা হয়তো এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বা সমস্যাসংকুল বছর হিসেবে বিবেচনা করবেন গেল বছরটিকে। এর একটি বড় কারণ হতে পারে কভিড-উত্তরকালে যে পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া ছিল তা গত বছরে শ্লথ হয়ে এসেছে। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি খাতে প্রবৃদ্ধি হলেও সার্বিক প্রবৃদ্ধি হার আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রবৃদ্ধির ধারা ক্রমান্বয়ে শ্লথ হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে চলতি অর্থবছর শেষ হলে হয়তো অবক্ষয়ের চিত্রটি পুরোপুরি ফুটে উঠবে আমাদের সামনে। কভিডের দুই বছর বাদ দিলে প্রবৃদ্ধির হার হয়তো সর্বনিম্ন স্তরে চলে যাবে। এক্ষেত্রে বড় কারণ হিসেবে বলা যায় যে এ সময়ে ব্যক্তি খাত তো বটেই, সরকারি খাতেও বিনিয়োগের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এতে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যদিও এ সময়ে বিদেশে কাজের সন্ধানে গেছে দ্বিগুণের অধিক অনাবাসিক শ্রমিক। যদিও সে তুলনায় রেমিট্যান্সপ্রাপ্তি নগণ্য। অর্থনীতি যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা চিহ্নিত করতে গেলে প্রথমে বলতে হবে, প্রবৃদ্ধির হার শ্লথ হয়ে যাওয়া, ব্যক্তিগত ও সরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ বাজারে। এতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ঢিলেঢালা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

পেছনে ফিরে দেখলে দেখা যায়, বাংলাদেশের আর্থিক খাত অনেক দুর্বল, কর আহরণের ক্ষমতা বিশ্বের সর্বনিম্নদের মধ্যে। এতে সরকারের খরচ করার ক্ষমতা অনেক সীমিত হয়ে গেছে। খরচ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে, অর্থাৎ সম্প্রসারণশীল অর্থনীতি করার জন্য যে সক্ষমতাটা দরকার তা এ মুহূর্তে সরকারের নেই। ফলে সরকারি বিনিয়োগ কমার কারণ হিসেবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। সরকারের হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই।

এতদিন ধরে আর্থিক খাতের দুর্বলতার কথা মানুষ জানলেও, বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ৪, ৫ বা ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখতে পেরেছিলাম। এবং কম খরচ করে ও কম আদায় করে কম খরচের মাধ্যমে চলছিলাম। কিন্তু এখন যে সমস্যাটা দেখা দিয়েছে যা আগে ছিল না, তা হলো গত বছর বা এর কিছু আগ মুহূর্ত থেকে শুরু করে বৈদেশিক খাতের লেনদেনেও অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ যে হারে রপ্তানি বেড়েছে তার চেয়ে বেশি হারে আমদানি বেড়েছে। আমদানি পণ্যের আর্থিক মূল্য রপ্তানি মূল্যের চেয়েও বেড়ে গেছে। এতদিন যে বড় বড় ঋণ নেওয়া হয়েছে তা পরিশোধের সময় হয়েছে। অর্থাৎ কেবল বাণিজ্যিক লেনদেনে ঘাটতি বেড়েছে তা না, বরং আর্থিক খাত থেকে অধিক অর্থ এনে ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমেছে। সুতরাং ২০২৩ সাল বৈদেশিক মুদ্রার মজুদহানির বছর হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নির্বাচন সামনে রেখে সরকার অনেকগুলো অবকাঠামো উদ্বোধন করেছে, যার মধ্যে বেশির ভাগই ব্যয়বহুল। আবার কিছু কাজ শেষের আগেই উদ্বোধন হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অবকাঠামো কৃতিত্বপূর্ণ হলেও দুঃখজনকভাবে সরকার তার ক্রেডিট উপভোগ করতে পারছে না। সরকারের অবকাঠামো নির্মাণের কৃতিত্ব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দায়দেনা পরিস্থিতি, টাকার মূল্যপতনে ঢাকা পড়ে গেছে। অর্থাৎ ভৌত অবকাঠামোর অর্জনগুলো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের সঙ্গে খুব বেশি মেলানো যায় না। অবকাঠামোগুলোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার সামঞ্জস্য ছিল কি না এ বিচার ভবিষ্যৎ করবে। গত পাঁচ বছরে আমাদের মাথাপিছু পরিশোধযোগ্য দায়দেনা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৩০০ বা ৩৫০ ডলার থেকে এখন মাথাপিছু দেনা ৬০০ ডলারে চলে গেছে। আগামী দিনের দায়দেনা পরিস্থিতি টেকসই রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে গেছে।

গত বছরটিতে বিভিন্ন রকমের সমস্যার মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের উত্থান-পতনের চাপ। সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুর্বলতা। এবং বহুদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো না করার ফলে সৃষ্ট সংকট। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক খাতের অনাদায়ী ঋণ, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সম্পদ আহরণ বাড়াতে না পারা, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা, অতিমূল্যায়িত প্রকল্প নেওয়া। এ সমস্যাগুলোর সমাধান না হওয়ায় সংকট বেড়েছে। উচ্চাকাক্সক্ষা থেকে নেওয়া ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। রিজার্ভ পতন একটা উদ্বেগের জায়গা হিসেবে ছিল এবং এর প্রভাব পড়েছে অন্যান্য জায়গায়। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে যাওয়ায় আমাদের এলসি বা ঋণপত্র নিয়ন্ত্রণ করেছি। বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেনের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ায় আমাদের স্থানীয় মুদ্রা অর্থাৎ টাকার ওপরেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এ সময়ে টাকার মূল্যমানের অবনমন ঘটেছে ২৫-৩০ শতাংশ। 

বৈদেশিক লেনদেনের জায়গায় যে ভারসাম্যহীন অবস্থা গেল যা বিনিয়োগের জায়গায় মুদ্রার ওপর যেমন চাপের সৃষ্টি করল, তেমনি পণ্যমূল্য বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। এ বছরের মূল্যস্ফীতির প্রবণতা লক্ষ্য করে দেখব এটি যে কেবল শহরে বেড়েছে এমন নয়, গ্রামেও বেড়েছে। গ্রামের খাদ্য মূল্যস্ফীতি বরং আরও ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকার আগে বড় ধরনের প্রকল্প ঋণ করেছে এবং এবার বাজেট সমর্থনের জন্য বড় ঋণ করেছে। ফলে আমাদের দায়দেনা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সরকারের রাজনৈতিক সংকট পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সরকার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে, সংস্কার পদক্ষেপ নিয়ে এগোতে পারবে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক সমাধান বাদ দিয়ে এ অনিশ্চয়তা কাটবে না। এক্ষেত্রে বাজার সংস্কার বলেন বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বলেন না কেন তা করার ক্ষেত্রে সরকারের আত্মশক্তিতে একটা ঘাটতি থাকবে। নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা থাকলেও রাজনৈতিক বৈধতার জায়গাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। নির্বাচনে অন্যান্য বিরোধীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়া, ভোটদানের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষুন্ন হয়েছে। এ কারণে বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকার কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে পারছে বলে মনে হয় না। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, পুঁজিবাজারে যারা তছরুপ করছে তাদের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেয়নি। একইভাবে জ্বালানি খাতে যারা বসে থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে যাচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। নির্মাণ খাতে ১০ টাকার পণ্য যারা ১০০ টাকায় কিনেছে সেটাও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের ব্যাপারটা যদি বলতে হয় তাহলে বলা যায়, সরকার কায়েমি শক্তির কাছে জিম্মি না হোক, অসহায় থেকেছে। এ সরকারের দুর্ভাগ্য যে ১৫ বছরের শাসনামলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাসহ অবকাঠামোয় অনেক অর্জন থাকলেও নির্বাচনে যাওয়ার সময় তারা জনগণের মনে এসব বিষয় ভালোভাবে স্থাপন করে যেতে পারল না। 

আগামীর দিকে যদি তাকাই তাহলে সামনে নির্বাচনকেন্দ্রিক বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেকেই আশা করছেন, নির্বাচনের পর হয়তো সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ আসবে, বহুদিনের জমে থাকা সংস্কার কর্মসূচি কার্যকর হবে, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পরিপালন করব। অবশ্য এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত না। কারণ এগুলো করার জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক মোমেন্টাম বা ত্বরণ দরকার পড়ে তার কোনো চিহ্ন আপাতত দেখতে পাচ্ছি না। নির্বাচন হয়ে গেলে তৎপরবর্তী সরকারের মনোভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সদিচ্ছা ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাপেক্ষে ভবিষ্যতে হয়তো এ নিয়ে কথা বলতে পারব। বর্তমান পরিস্থিতিতে বলতে পারি, একটি অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা ২০২৪-এ প্রবেশ করছি। তাই অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসাটাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com