দুই সংস্থার পর্যবেক্ষণ

বেড়েছে হেফাজতে মৃত্যু, মানবাধিকার পরিস্থিতি খুব খারাপ

দেশের দুটি মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টিতে সুষ্ঠু নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়ন বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু বেড়েছে। সদ্য শেষ হওয়া বছরে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল বলেও পর্যবেক্ষণ এসেছে সংস্থার দুটি পক্ষ থেকে।

২০২৩ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) সংবাদ সম্মেলন করে তাদের এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। গতকাল রবিবার সংস্থা দুটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত আসকের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফারুক ফয়সাল বলেন, ‘বিএনপির ২৮ অক্টোবর সমাবেশ-পরবর্তী তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৫৩৪টি মামলা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব মামলায় প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে।’ তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ সংখ্যাকে ১১ হাজার বলে দাবি করেছেন।

এ ছাড়া ন্যায্য মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভে দমনপীড়ন, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক কর্মীদের আন্দোলনও চলছে দমনপীড়ন।

আসকের নির্বাহী পরিচালক জানান, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের নেতাদের বিচারিক হয়রানি করা হয়েছে। বিক্ষোভ আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্তি প্রয়োগ, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের হয়রানি, ভয় দেখানো এবং বেআইনিভাবে আটক রাখার অভিযোগ সামনে এসেছে।

এ ছাড়া গত ২৮ অক্টোবর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২৪১টি যানবাহন ভাঙচুর, ৩৭৬টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। শুধু রাজধানীতে ১২৩টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে। তিনটি ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে। কারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করার দাবি জানায় আসক।

আসকের হিসাবে, দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন ২০ জন। এ ছাড়া পুলিশের হেফাজতে ১৩, র‌্যাবের হেফাজতে ২, গোয়েন্দা হেফাজতে ৩ জন নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। কারাগারে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে মারা গেছেন ১০৫ জন। তাদের মধ্যে কয়েদি ৪২ ও হাজতি ৬৩ জন।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০২৩ সালে ২৯০ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। এসবের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুম, আদিবাসী, নারী, শিশু ও শ্রমিক অধিকার, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার, শিক্ষার অধিকার বিষয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনটি।

আসকের চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্না বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক প্রার্থীর হলফনামায় উল্লিখিত সম্পদের পরিমাণ গত পাঁচ বছরে কয়েকশগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে অনেকের সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ অস্বাভাবিক। হলফনামায় উল্লিখিত সম্পদের বিবরণী বিষয়ে তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার নেই, এমন অজুহাত দিয়ে দায় এড়াচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল করিম ও সমন্বয়ক তামান্না হক রীতি।

‘দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ’ : দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। মানবাধিকারের কথা তুললে সরকার বিরক্ত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৩ : এমএসএফের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।

সুলতানা কামাল বলেন, মানবাধিকারের কথা তুললে সরকার বিরক্ত হচ্ছে। যারা মানবাধিকারের কথা বলছেন, তাদের বৈরিতার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র ও মানবাধিকারকর্মীদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে।

দেশের গত এক বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানবাধিকারের প্রতি সম্মান করা, সুরক্ষা দেওয়া এবং মানবাধিকারবোধ বাস্তবায়ন করা। গত এক বছরে এসব ব্যাপারে রাষ্ট্র মনোযোগী ছিল না। যখনই মানবাধিকারের কথা উঠেছে, তারা আত্মরক্ষামূলক কথা বলেছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান করা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৩ : এমএসএফের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এমএসএফের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান।