মিটার পরিবর্তনে ঘুষ ১০ লাখ টাকা

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় পোস্টপেইড মিটার পরিবর্তন করে প্রিপেইড মিটার সংযোগে অফিস খরচের নামে মিটারপ্রতি এক হাজার টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ, সন্দ্বীপ বিউবোর তিনজন উপসহকারী প্রকৌশলীসহ বিদ্যুৎকর্মীদের বিরুদ্ধে। দুই মাস ধরে বিদ্যুৎ অফিসের মিটার রিডার, লাইনম্যান ও ইলেকট্রিশিয়ানদের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট তিন উপসহকারী প্রকৌশলীর নির্দেশে সন্দ্বীপের বিভিন্ন ইউনিয়নের হাটবাজার ও বাড়িঘর থেকে ইতিমধ্যে হাতিয়ে নিয়েছে ১০ লক্ষাধিক টাকা।

বিদ্যুৎ অফিস-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দুই মাস আগে পোস্টপেইড মিটার পরিবর্তন করার জন্য সন্দ্বীপে দুই হাজার নতুন প্রিপেইড মিটার এসেছে। দুই হাজার মিটারের মধ্যে এর মধ্যে এক হাজারেরও বেশি প্রিপেইড মিটার লাগানোর কাজ শেষ।

মগধরা ইউনিয়নের রমনি পন্ডিতের বাড়ির বিষ্ণু মজুমদার অভিযোগ করে বলেন, ‘বিদ্যুৎ অফিসের মিটার রিডার প্রাণ গোপাল আমাদের বাড়িতে ২০টি প্রিপেইড মিটার লাগিয়েছেন। প্রতিটি মিটার বাবদ অফিস খরচ এক হাজার, কারও কাছে দেড় হাজার টাকা নিয়েছেন। মিটার লাগানোর সময় চা-নাশতা খরচ বাবদ নিয়ে গেছেন ২০০-৩০০ টাকা। আমাদের টাকায় কেনা পোস্টপেইড মিটারগুলোও তারা নিয়ে গেছেন।’

গুপ্তছড়া বাজারের ব্যবসায়ী বিধান বনিক বলেন, ‘বিদ্যুৎ অফিসের লোক এসে বলেছেন এখন অফার চলছে। এক হাজার টাকা দিলে প্রিপেইড মিটার ফ্রি পাবেন। এখন না লাগালে পরে পোস্টপেইড মিটারের মতো ১০ হাজার টাকা দিয়ে প্রিপেইড মিটার কিনে লাগাতে হবে।’

মিটারপ্রতি এক হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মিটার রিডার প্রাণ গোপাল বলেন, ‘টাকা নেওয়া হয়েছে উপসহকারী প্রকৌশলী আশফাকুর রহমান স্যারের নির্দেশে। টাকাগুলো স্যারের কাছে জমা দিয়েছি। আমরা ছোট কর্মচারী, অফিস থেকে যা বলে তাই করি।’ প্রিপেইড মিটার সংযোগ দিতে মিটারপ্রতি এক হাজার, কারও কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরত প্রাণ গোপাল, তাসফিক, আবেদ, জাবেদসহ ১০ জন মিটার রিডার, লাইনম্যান ও ইলেকট্রিশিয়ান। তাদের প্রত্যেকের দাবি, অফিসের নির্দেশে তারা টাকা নিয়েছেন এবং অফিসে জমা দিয়েছেন।

চাঁদাবাজির বিষয়টি স্বীকার করে তড়িৎবিদ (ইলেকট্রিশিয়ান) কপিল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এই টাকা একা খাওয়ার জন্য নিইনি। তিনজন উপসহকারী প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে মিটারগুলো লাগানো হয়েছে।’

বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সন্দ্বীপ, বিউবো, চট্টগ্রামের উপসহকারী প্রকৌশলী আশফাকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের লোকবল কম। বাইরের কিছু লোক এনগেজ করেছি। ওরাই মূলত ঝামেলাটা লাগিয়েছেন।’

অফিসে টাকা নেওয়ার বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী নাহিদ খান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো টাকা নিইনি।’ গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ছবি দেখানোর পর তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।’

আরেক উপসহকারী প্রকৌশলী রবি চৌধুরী বলেন, ‘মিটার রিডার, লাইনম্যান, ইলেকট্রিশিয়ান যারা টাকা নিয়েছেন, নিজেদের বাঁচানোর জন্য এখন অফিসের নাম বলছেন। অফিসে কে, কেন টাকা নিয়েছেন এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। যিনি নিয়েছেন সেটা সম্পূর্ণ তার দায়বদ্ধতা।’

গত ১৪ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে কথা হয় বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সন্দ্বীপ, বিউবো ও চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রিপেইড মিটারের জন্য এক হাজার টাকা লাগে না।’

গ্রাহকের টাকায় কেনা পোস্টপেইড মিটার অফিসে নিয়ে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সন্দ্বীপ, বিউবো ও চট্টগ্রামের সহকারী প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘পোস্টপেইড মিটারে লাস্ট রিডিং থাকে। ওই রিডিং অনুযায়ী বিল হয়। রিডিং ঠিক আছে কি না দেখার জন্য বিলগুলো যেকোনো সময় অডিট চেক করতে পারে। অডিট হওয়ার পর এগুলো আর কাজে লাগে না। কোনো কাজেও আর ব্যবহার করা যাবে না।’

অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘প্রিপেইড মিটার লাগাতে এক হাজার টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই। আপনারা সন্দ্বীপের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেন। খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’