১৫ বছর ধরে ১ জানুয়ারির বই উৎসব সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সকাল হলেই শিক্ষার্থীরা স্কুলে যায়। নতুন বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরে। সে এক অন্য রকম আনন্দ। কিন্তু খোদ রাজধানীতেই থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার গাফিলতিতে নতুন বই পায়নি দুই শতাধিক বেসরকারি স্কুল। ফলে সকাল থেকে তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর হতাশা আর মনোবেদনা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে শিক্ষার্থীরা।
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন যেসব বেসরকারি স্কুলের ইআইআইএন (এডুকেশনাল ইনস্টিটিউট আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) নেই, তাদের বছরের প্রথম দিন বই দেননি ক্যান্টনমেন্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার। তবে এসব স্কুলের প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব বই যথাসময়ে পৌঁছে দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন থানা শিক্ষা অফিসার। আর বই না পেয়ে রাজধানীর মাটিকাটার স্কাইলার্ক মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী নাফিজা আঞ্জুম, রাকিবুল ইসলাম, রত্না আক্তারসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ফিরে গেছে মন খারাপ করে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, প্রাক-প্রাথমিক থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত শতভাগ বই উপজেলা শিক্ষা অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আর অষ্টম ও নবম শ্রেণির অর্ধেকের বেশি বই পৌঁছানো হয়েছে; অর্থাৎ শুধু অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সব বই পাবে না। তবে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শতভাগ বই পাওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বছরের শুরুতে সাধারণত মার্চ মাসে সব ধরনের স্কুল থেকে বইয়ের চাহিদাপত্র নেয় এনসিটিবি। এরপর সেই চাহিদা অনুযায়ী উপজেলা শিক্ষা অফিসে (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক) বই পৌঁছে দেয়। আর উপজেলা অফিস থেকে সরকারি-বেসরকারি সব স্কুলে চাহিদা অনুযায়ী বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হয়।
রাজধানীর মাটিকাটার স্কাইলার্ক মডেল স্কুলের অধ্যক্ষ মো. সাফায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার শতাধিক। এর মধ্যে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু আমরা তাদের কাউকে বই উৎসবের দিনে নতুন বই দিতে পারেনি। খুবই মন খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। আমরা কিন্তু বছরের শুরুতে সঠিকভাবেই চাহিদা দিয়েছি। এরপর দুই সপ্তাহ ধরে শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে আমাদের কোনো বই দেওয়া হয়নি। অথচ প্রাথমিকের শতভাগ বই আমরা পেয়েছি।’
একই কথা বলেন আইডিয়াল পাবলিক স্কুলের অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তার। তার স্কুলেও মাধ্যমিকের কোনো বই দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের সবাই মন খারাপ করে বাড়ি ফিরেছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী নানা দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের অফিসে লোকবলেরও সংকট রয়েছে। ফলে যেসব স্কুলের ইআইআইএন নম্বর নেই, তাদের বই আমরা এখনো দিইনি। হয়তো কাল-পরশু থেকেই তাদের বই দেওয়া শুরু করব। তবে আমাদের বইয়ের সংকট নেই।’ তাহলে বই উৎসব কীভাবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাল-পরশুর মধ্যেই তারা বই পাবে।’
অভিযোগ রয়েছে, কিন্ডারগার্টেন বা ইআইআইএন নম্বর ছাড়া যেসব স্কুল রয়েছে, সেগুলোর বইয়ের চাহিদাপত্র জমা দেওয়ার সময় ঘুষ দিতে হয় ক্যান্টনমেন্ট থানার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে। স্কুলপ্রতি শুধু বইয়ের জন্যই এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা খরচ দিতে হয়।
প্রাথমিকে কেন্দ্রীয় বই উৎসব : এ বছর মাধ্যমিকে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো বই উৎসব হয়নি। তবে প্রাথমিকের বই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল রাজধানীর ন্যাশনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে নতুন বই হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন প্রধান অতিথি ও মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ রেজওয়ান হায়াত।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন বই শিশুদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নতুন বছরের উপহার। নতুন বই শিশুকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ শিশুকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা শিশুর মনোজগতে বিস্ময় তৈরি করে। শিশুমনের এ আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহে বই বিতরণের সূচনা। সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন বই উৎসবে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ শিক্ষাবর্ষে ৩ কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার ৩২৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে ৩০ কোটি ৭০ লাখ ৮৩ হাজার ৫১৭ কপি বই। এর মধ্যে প্রাথমিকে ২ কোটি ১২ লাখ ৫২ হাজার ৬ জন শিক্ষার্থী পাচ্ছে ৯ কোটি ৩৮ লাখ তিন হাজার ৬০৬ কপি বই।