প্রাণসংহারী আতশবাজি

যুদ্ধের ভূগোলে রাতের আকাশে প্রতিপক্ষের রকেট-ক্ষেপণাস্ত্র আলোর রোশনাই জ্বালিয়ে আতশবাজির মতো জনপদের ওপর নেমে আসার ফুটেজ ও ছবি আমরা ইন্টারনেটে দেখেছি। সেসব ঘটনার নিচের আতঙ্কিত ও অসহায় জনপদের ছবিও আমাদের চেনা। কিন্তু থার্টিফার্স্ট নাইটে ঢাকার কথা ভাবতেই যুদ্ধের ভূগোলে রাতের আকাশে আলোর ফুলঝুরি তুলে ছুটে আসা সেই মারণাস্ত্রের ইমেজটির কথাই মনে পড়ল। একটি ঘটনার উদ্দেশ্য ধ্বংস, অন্যটির উদ্দেশ্য আনন্দ।

একসময় পশ্চিমা সংস্কৃতি বলে আমাদের এখানে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনকে নিরুৎসাহিত করা হলেও সেই বাস্তবতা এখন আর নেই। এখন দেশি-বিদেশি সব সংস্কৃতি, উৎসব-উদযাপন মিলেমিশে একাকার। ফলে এবারও, নতুন বছর শুরুর সন্ধিক্ষণে রাজধানী কেঁপে ওঠে আতশবাজি ও পটকার শব্দে, আকাশে উড়তে শুরু করে ফানুস। বিষয়টি এখন আর ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, দেশের সব বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘পটকা ফানুসে ৩ স্থানে আগুন ৯৯৯-এ ৯৭১ কল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই ইংরেজি নববর্ষের রাতে রাজধানীতে আতশবাজি, পটকা ফোটানো ও ফানুস ওড়ানো হয়েছে। এ সময় উচ্চৈঃস্বরে লাউডস্পিকারে গান-বাজনা ও শব্দদূষণ সংক্রান্ত সারা দেশে ৯৭১টি অভিযোগ পেয়েছে ‘জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯’। এ ছাড়া আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানোর কারণে সারা দেশে তিনটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) আতশবাজি ও পটকা না ফোটানো, ফানুস না ওড়ানো ও উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠান করা যাবে না-সহ ১২টি নির্দেশনা জারি করে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে। প্রকৃতপক্ষে ওই নির্দেশনা ছিল উপেক্ষিত। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলেও আমাদের কাছে কোনো খবর নেই। ফলে, এই নিষেধাজ্ঞা কাজীর গরুর মতো আইনে আছে গোয়ালে নেই-এর মতনই।

গত রবিবার সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আতশবাজি-পটকা ফোটানোর শব্দ শোনা যায় বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। পরে তা রাত ১২টার কাছাকাছি সময় আরও বেড়ে যায় এবং সেখানে যুক্ত হয় ফানুস ওড়ানো। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর মজিবর ঘাট এলাকার একটি বাসার ছাদে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুন জ্বালানোর সময় তিন কিশোর দগ্ধ হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর বলেছে, দুই কারণে বিগত পাঁচ বছরে দেশে ২৮০টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে আতশবাজির উচ্চ শব্দে তানজিম উমায়ের ওরফে মাহমুদুল হাসান নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গোপনে বিক্রি হয় ফানুস ও আতশবাজি। অনলাইনেও মিলছে এসব সামগ্রী। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও চকবাজারে বিভিন্ন প্রকারের আতশবাজি উৎপাদন হয়ে থাকে। বর্তমানে আতশবাজি আমদানি করা কঠিন হলেও তা থেমে নেই।

থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন বরাবরই নগরকেন্দ্রিক। নগর কর্র্তৃপক্ষ নিজেরাই সেখানে নববর্ষ বরণের নানা আয়োজন করে। আতশবাজি ফোটানো হয়, এর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ও এলাকাও থাকে। এরপরও কি উৎসবকে নিয়মের মধ্যে আটকে রাখা যায়? দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার একটি প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ছুটির দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম বিপজ্জনক দিন এটি। ২০২১ সালের ইতালির রোমে আতশবাজির শব্দে রাস্তায় শত শত পাখি মরে পড়ে ছিল। ভারতের বড় শহরগুলোতে নানা উৎসবে আতশবাজি ফোটানো নিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। থার্টিফার্স্টের মতো বৈশ্বিক উদযাপনে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার কোনো কারণ নেই। আমাদের দেশে যে কোনো নাগরিক উৎসবের মতো থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের ক্ষেত্রও সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে নিরাপত্তার নামে। ফলে এক রাতের ‘বেপরোয়া’ উদযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এ শহর আরও বিপর্যস্ত হবে।