ফৌজদারি মামলায় অপরাধ প্রমাণে সাক্ষীর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ও প্রমাণ হিসেবে ভূমিকা রাখে আলামত। সেজন্য অপরাধ সংগঠনের পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত আলামত সংগ্রহ করে। আলামত নষ্ট হলে বা হারিয়ে গেলে মামলা প্রমাণ দূরহ হয়। তখন ন্যায় বিচারও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মামলার আলামত সংরক্ষণের জায়গাকে আদালত সংশ্লিষ্টরা বলেন মালখানা। ঢাকার আদালত এলাকায় দুটি মালখানায় বছরের পর বছর পুরনো হচ্ছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত। আইনজীবীরা বলেন, মামলা যেমন বছরের পর বছর জটে পড়ে তেমনি আলামতও বাড়তে বাড়তে মালখানা ভরে উঠে। দিনের পর দিন পুরনো আলামতের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন আলামত।
ঢাকার আদালত এলাকায় সিএমএম (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালত ভবনের নিচে (গ্রাউন্ড ফ্লোরে) একটি এবং পাশেই সিজেএম (চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) আদালত ভবনের নিচে (গ্রাউন্ড ফ্লোর) একটি মালখানা রয়েছে। সম্প্রতি দুটি মালখানা ঘুরে দেখেছেন এ প্রতিবেদক।
তাতে দেখা গেছে— ধারণক্ষমতার বেশি আলামত রয়েছে মালখানাগুলোতে। অসংখ্য আলামত পুরনো হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে, জং ধরছে। খালি ড্রাম, প্লাস্টিকের গ্যালন, মোটরসাইকেল, লোহার চেয়ার, ভ্যান, রিকশা, বাঁশের লাঠি, লোহার রড, সোফা, খাটসহ হাজার হাজার আলামত দেখা গেছে। একটির ওপর রাখা হয়েছে আরেকটি। কোনো কোনো আলামতে মরিচা ধরেছে। অনেক আলামতে ধুলোর আস্তরণ জমেছে। ভেঙে যাচ্ছে অনেক আলামত।
মালখানার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরতরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার পর আলামত আদালতের মালখানায় পাঠানো হয়। ৫ থেকে ২০ বছরের পুরনো মামলার আলামতও সবচেয়ে বেশি রয়েছে মালখানাতে। বিধান হলো যতদিন মামলার বিচারকাজ চলবে ততদিন পর্যন্ত আলামত অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু এত অল্প জায়গায় বছরের পর বছর হাজার হাজার আলামত সংরক্ষণ যথেষ্ঠ কষ্টসাধ্য।
তারা আরও বলেন, সংরক্ষণ বলতে আলামতের গায়ে মামলা সংক্রান্ত তথ্য সেঁটে দিয়ে এখানে সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়। তবে মাদক মামলার ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণের ভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। মাদকের মামলায় আলামত দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে উদ্ধারকৃত নমুনা (স্যাম্পল) বিশেষ স্থানে রেখে মাদকের অন্য আলামতগুলো আদালতের অনুমতি নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। আর উদ্ধার সংক্রান্ত সকল তথ্য মামলার নথিতে থাকে।
অন্য আলামতের ক্ষেত্রে যেগুলো ধ্বংস বা পুড়িয়ে ফেলা যায় না— সেগুলো মামলা নিষ্পত্তির পর নিলামে বিক্রি হয়। কিন্তু নিলাম ডাকের আগেই অনেক সময় এসব দ্রব্য ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠলেও তা বিক্রি হয়ে যায়।
সিজেএম ভবনের মালাখানার রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বরত পুলিশ পরিদর্শক (ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালত) মো. আতিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তি হলে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকি। তখন নিলামে এগুলো বিক্রি হয়।’ তিনি বলেন, ‘৫/ ৭/ ১০ বছরের পুরনো আলামত আছে। এর চেয়ে পুরনো কিছু থাকলেও খুব কম। এখন ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। ফলে আলামতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়ন দ্রুত হচ্ছে।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ফৌজদারি মামলায় কমপক্ষে এক বছরের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তি হয় না বললেই চলে। কয়েক বছর ধরে চলা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আলামত এভাবেই রাখতে হয়। সংকীর্ণ এই স্থানে এত বিশাল আলামত রাখা যেমন কঠিন— তেমনি নিরাপত্তাজনিত সমস্যা বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও থাকে। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সিজেএম আদালতের মালখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও বড় ধরনের ঘটনার ঝুঁকি থেকে যায়।
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত- ১০ এর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফৌজদারি মামলায় আলামতের গুরুত্ব অনেক। এগুলো অভিযোগ প্রমাণে সহায়ক হয়। তাই মামলা নিষ্পত্তি পর্যন্ত আলামত যত্ন সহকারে প্রদর্শনযোগ্য হিসেবে রাখা নিয়ম। কিন্তু মামলা চলে বছরের পর বছর। যে কারণে অনেক আলামত পূর্বের অবস্থায় না থাকাই স্বাভাবিক। আর ঢাকার জনবহুল আদালত এলাকার মালখানার জায়গা একেবারেই কম। আলামত সংরক্ষণের মতো জায়গা ও পরিবেশ নিয়ে কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।’
ডিএমপির উপ- কমিশনার (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলামত আদালতে আনা হয়। মামলা নিষ্পত্তির সঙ্গে মিলিয়ে আলামতের বিষয়টিও নিষ্পত্তি হয়। মালখানার এখন যে ধারণক্ষমতা এর অতিরিক্ত রাখতে হচ্ছে। কিছু রাখা হচ্ছে বিভিন্ন থানায়।’
তিনি বলেন, ‘মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলে আর আলামতের বিষয়ে যদি আদালতের নির্দেশনা থাকে তাহলে এটা সকল বিচারপ্রার্থীর জন্য যেমন সহায়ক তেমনি আলামতের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।’ তিনি জানান, মালখানার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটরা। তারা রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভালের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। এখন এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত থাকলে সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।