জাপায় হচ্ছেটা কী!

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে এসে আবারও নাটকীয়তা জমে উঠেছে জাতীয় পার্টিতে (জাপা)। দলটিতে প্রতিদিনই নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া প্রার্থীদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। আজ বুধবারও চারজন প্রার্থী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

এর আগে ১৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৬টি আসনে সমঝোতা করে নির্বাচনে থাকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। একইদিন তালিকায় জায়গা না পেয়ে দলের কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টুসহ ২৬ জন নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন।

আজ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন গাইবান্ধা-৫ আসনের জাপা প্রার্থী আতাউর রহমান সরকার। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী ক্যাম্প আগুনে পোড়ানো, প্রশাসনের অসহযোগিতা, কর্মীদের মারপিট এবং হুমকি কারণে সরে দাঁড়িয়েছি। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।’

কেবল আতাউর রহমানই নয়, এদিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী সাব্বির আহমদ, চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে সোহরাব হোসেন ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসন থেকে রবিউল ইসলাম। এর আগে কমপক্ষে আরও ১৫ জন জাপা প্রার্থী বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচনে না থাকার ঘোষণা দেন।

এসব প্রার্থীরা বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে সরকারের চেয়ে নিজ দলের ওপর তাদের ক্ষোভ বেশি। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের মাঠে নামার আগে দল থেকে প্রার্থীদের খরচ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্ত তা দেওয়া হচ্ছে না।  দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। এমনকি নির্বাচন পরিচালনা করতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তারাও প্রার্থীদের কোনো খবর নেন না।

বরিশাল-২ ও ৫ আসনে জাপা প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস নির্বাচন থেকে আগেই সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত জাপার মনোনীত’ যারা বলেন তাদের জাপায় থাকার অধিকার নেই। এই নেতৃত্ব তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন। ২৬টি আসনের লোভে দলটা নষ্ট করা হচ্ছে। এই ২৬ আসনের বাইরে যারা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তাই আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।’

বরগুনা-১ আসন থেকে সরে যাওয়া খলিলুর রহমান বলেন, ‘অনেক প্রার্থী প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করছে। নিজেকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দাবি করছে। এসব নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করে, লজ্জায় ভোট চাইতে পারি না। বড় কিছু দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই ফলে মানুষ ভোটে আসতে চায় না। গ্রাম-গঞ্জে ভোট চাইতে গেলে বলে আপনাকে ভোট দিয়ে লাভ নেই, আপনারা বিরোধী দল না। আপনাদের আর আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া একই কথা। নেতাদের এমন সিদ্ধান্তে জাপা তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।’

চুয়াডাঙ্গা-১ থেকে সরে যাওয়া সোহরাব হোসেন বলেন, ‘অন্য প্রার্থীদের খরচের কাছে টিকে থাকা সম্ভব নয়। জাপার কেন্দ্রীয় নেতাদের অসহযোগিতার কারণে আমি প্রচারণা বন্ধ করেছি, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।’

প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘মিডিয়ার সামনে আমাদের দোষ দিয়ে যারা নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন তারা দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই কাজ করছেন। যারা নির্বাচন থেকে সরে যাচ্ছেন, তারা নিজেদের স্বার্থে সরে যাচ্ছেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করে আগামীতে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এর আগে ১ জানুয়ারি জি এম কাদের রংপুরে বলেছিলেন, নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত তিনি থাকবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। জাপার কোনো প্রার্থী যদি নির্বাচন করতে না চায় তাহলে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ওই প্রার্থীর রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার এক কো-চেয়ারম্যান বলেন, ‘যারা নির্বাচনে অংশ নেবে তাদের আর্থিক সহযোগিতা করা হবে এমন একটা নির্দেশনা ছিল। সরকার থেকে সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার চাপ ছিল। ফলে জয়ের সম্ভাবনা না জেনেও অনেকেই প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্ত সরকার থেকে টাকা দেওয়ার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তা রাখা হয়নি। আবার দলের আরেকটা প্রস্তাব ছিল যেসব আসনে আওয়ামী লীগ ছাড় দেবে সেই প্রার্থীদের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হবে যা বাকি প্রার্থীদের দেওয়া হবে। কিন্ত কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয়নি। কেউ ছাড় পেয়ে এমপি হবে আর বাকিরা টাকা খরচ করবে মাঠে থাকতে তা তো হতে পারে না।’ 

জাপার দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ঘোষণা দেওয়া প্রার্থীদের চেয়ে ঘোষণা না দিয়ে সরে গেছেন এমন প্রার্থীদের সংখ্যা বেশি।  নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না নেওয়া প্রশ্নে জাপায় শুরু থেকেই দ্বিধা ছিল। শেষ পর্যন্ত নানামুখী চাপে নির্বাচনে যেতে বাধ্য হন জি এম কাদের। নির্বাচনে যেতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৬ আসনে সমঝোতা হয়। তবে সমঝোতার তালিকায় জায়গা না পেয়ে সিনিয়র নেতারা নির্বাচন থেকে সরে যেতে চেয়ারম্যান-মহাসচিবকে চাপ দেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে জাপা নেতাদের মধ্যে দ্বন্ধ চলছে। এই দ্বন্ধ কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়ছে। জাপা মহাসচিব ১৭ ডিসেম্বর বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে যখন নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তখন তার আশপাশে জাপার ৫ কো-চেয়ারম্যানদের কেউ ছিলেন না, এমনকি সভাপতিমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো সদস্যকেও দেখা যায়নি। একইভাবে জাপার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার দিনও দলের কো-চেয়ারম্যান কিংবা সভাপতিমণ্ডলীর কেউ উপস্থিত ছিলেন না।