দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে ব্রাসেলসভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। সংস্থাটি মনে করছে, ৭ জানুয়ারির নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতির চলমান বিভাজন আরও বাড়াতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়াচ্ছে সহিংসতার ঝুঁকি। তবে আসন্ন এ সংকট নিরসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংলাপ দেশকে স্থিতিশীল রাখতে সহযোগিতা করবে বলেও উল্লেখ করেছে আইসিজি। অবশ্য ভোটের আগে সে সুযোগ নেই উল্লেখ করে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইসিজি বলেছে, সংকটের সমাধান এবং আরও অস্থিতিশীলতা রোধ করার লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধীদের উচিত ভোটের পর আলোচনা শুরু করা।
গতকাল সংস্থাটির ওয়েবসাইটের প্রকাশিত প্রতিবেদনের সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ৭ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। কর্র্তৃত্ববাদ ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মধ্যে অনেকটাই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ওপর সরকারের দমনপীড়ন ও বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গ্রেপ্তার উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিরোধীদের নির্বাচন বর্জনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সংস্থাটির মতে, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ ও ’১৮ সালে নিজ তত্ত্বাবধানে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতায় তার দলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক সম্পর্কের পালাবদল এবং নতুন করে উজ্জীবিত বিরোধী দল আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি একতরফা নির্বাচন করা কঠিন করে তুলেছে।
আইসিজি বলছে, বিরোধীদের নির্বাচন বর্জন মানে ভোটার উপস্থিতি সম্ভবত কম হতে যাচ্ছে। ব্যালটে তেমন বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প না থাকায় অসন্তুষ্ট বাংলাদেশিরা রাজপথে নামছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার উচ্চঝুঁকি রয়েছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যেও দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখা দিতে পারে। তবে জানুয়ারির নির্বাচন পিছিয়ে দিতে এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে উল্লেখ করে ‘নির্বাচনের চেয়েও অধিকতর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও জানুয়ারির নির্বাচন পিছিয়ে দিতে এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে তাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উচিত ভোটের পর উভয়পক্ষ থেকে ছাড়ের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে কাজ করা। বিদেশি অংশীদারদেরও সেটি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। আইসিজি বলছে, দেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে পাওয়া উত্তরাধিকার এবং একটি শক্তিশালী দলীয় কাঠামো থাকায় তিনি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে তার সাফল্য গড়ে তুলেছিলেন। তার সরকার এক দশকেরও বেশি সময় শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তার তদারকিতে নিরাপত্তা বাহিনী ২০০০-এর দশকে উত্থান হওয়া জিহাদি গোষ্ঠীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে। পুরনো মিত্র ভারতসহ বিদেশি সমর্থন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই ও রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রহণে তাদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, যা শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
আইসিজি বলছে, এসবের পরও যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার আওয়ামী লীগের সংকল্প বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে অবক্ষয় সাধন করেছে। গত এক দশকে শেখ হাসিনা আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, নিরাপত্তা সংস্থা ও নির্বাচনী কর্র্তৃপক্ষসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন; অনুগতদের এসব জায়গায় বসিয়েছেন। তার সরকারবিরোধী কর্মী, সুশীল সমাজের ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিকদের ওপরও নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। নিরাপত্তা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। আরও অনেক কর্মীকে অন্তহীন মামলায় আদালতে দৌড়াতে হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে নতুন কঠোর আইনে করা মামলাও।
আইসিজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নির্বাচনের পর থেকেই দেশ-বিদেশে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেক বাংলাদেশি অভিযোগ করেন, ১৫ বছর ধরে তারা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। তারা তাদের মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। এ সময়ে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে বেঁধে দেওয়া মুদ্রাবিনিময় হার নীতির ফলে এই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো প্রকটতর হয়েছে। এর মধ্যে ভিসা নিষেধাজ্ঞাসহ যুক্তরাষ্ট্রের নানা পদক্ষেপ বিএনপিকে জাগিয়ে তোলে, তারা ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে অসংখ্য বড় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথম। অবশ্য ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের পর সরকার দলটির বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ নেতাকে গ্রেপ্তার করে এবং কারাগারে রিমান্ডে নেয়। এসব ঘটনা দুপক্ষের মধ্যে বৈরিতা আরও তীব্র করেছে। শেখ হাসিনা বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ নাকচ করে দিয়েছেন। এদিকে বিএনপি ও তার মিত্ররা অর্থনীতিকে ব্যাহত করতে এবং সরকারকে তাদের নির্বাচনী দাবিতে রাজি হতে বাধ্য করতে হরতাল ও অবরোধের ডাক দিয়েছে। মোটকথা বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। এ অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে দুপক্ষকে সংলাপে বসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের উচিত তাদের সেদিকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করা।