ভারতীয় বিদ্যুতের খরচ বেড়ে দ্বিগুণ

২০২১-২২ অর্থবছরে ভারত থেকে ইউনিটপ্রতি গড়ে ৬ টাকা ১১ পয়সা দরে ৪ হাজার ৬৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকার বিদ্যুৎ আমদানি করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর বেড়ে ৮ টাকা ৭৭ পয়সা হয়েছে। মাত্র এক বছরে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২২৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে ব্যয় আরও বাড়বে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি হওয়ার পরও ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ বাড়ানো অযৌক্তিক। এর ফল ভয়াবহ। আর জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাহিদামতো উৎপাদন না হওয়ায় এবং ভারতের বিদ্যুতের দাম কম হওয়ায় আমদানি করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, আমদানির বাইরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে গড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। চলতি বছরে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। এ সময় আরও কিছু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে।

পিডিবির তথ্য মতে, ১০ বছর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারতের ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকার প্রথমবারের মতো প্রায় ২২৬ কোটি ৫০ লাখ ১৮ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করে। গড়ে ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ৬ পয়সা দরে ওই বিদ্যুৎ বাবদ ব্যয় ছিল ১ হাজার ১৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর দুই বছর পর আগের ৫০০ মেগাওয়াটের সঙ্গে নতুন আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়। পরের বছর যোগ হয় আরও ৪০ মেগাওয়াট। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারতের ৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আনে পিডিবি। এর পরের দুই অর্থবছরে ৫টি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পর এর সঙ্গে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যোগ হয় আদানির ১ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র।

বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। সর্বশেষ অর্থবছরে ৬টি কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৫১ কোটি ইউনিটেরও বেশি বিদ্যুৎ আনা হয়েছে ভারত থেকে।

১০ বছর আগে আমদানি করা বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২৬ কোটি ৫০ লাখ ১৮ হাজার ইউনিট। আর ১০ বছর পর বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় পৌনে ৫ গুণ। এ সময় আমদানি করা বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি হয়েছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ভারতের ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন কমবেশি ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই আমদানি করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ভারতের ৫টি কেন্দ্র থেকে আমদানি করা বিদু্যুতের দাম পড়েছে ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ২২ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৯৫ পয়সা। আর আদানির বিদ্যুতের দাম ১৪ টাকা ২ পয়সা।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানি বাড়লে ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি না করলে দেশে উৎপাদন বাড়াতে হতো। কিন্তু আমাদের পর্যাপ্ত গ্যাস নেই। চাহিদামতো গ্যাস আমদানিরও সুযোগ নেই। কারণ এর ব্যয় অনেক বেশি। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লা ও তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু এভাবে উৎপাদন করলে ব্যয় ভারতের বিদ্যুতের দামের চেয়ে বেশি পড়ত। আদানি বাদ দিলে ভারতের বিদ্যুতের দাম প্রায় অর্ধেক। এই বিবেচনায় আমাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে না, বরং লাভই হচ্ছে।’

‘আমাদের ক্লিন এনার্জিতে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সে সুযোগ আমাদের কম। নানা বিবেচনায় বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো হচ্ছে’, যোগ করেন তিনি।

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদনসক্ষমতা অনেক বেশি। নিজেদের কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনার সিদ্ধান্ত নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হলে এত বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র করার কী দরকার ছিল? বিদ্যুৎ খাতে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে গোলমেলে অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর থেকে দ্রুত বের হওয়া দরকার।’

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে পরনির্ভরশীলতা বাড়লে দেশেরই ক্ষতি। এতে যেমন দেশীয় বিদ্যুৎ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে কোনো ঝামেলা হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।’