যার অনুপ্রেরণায় টিনটিন

আমরা যখন ছোট এতটাই ছোট যে, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো দূরে থাক, বাসার নিচে মাঠে খেলতে নামলেও বাবা-মায়ের অনুমতি নিতে হতো তিনবার করে, তখন আমাদের অনুসন্ধিৎসু মনের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য ছিল টিনটিন। মাঠে খেলতে না দিলে কী-ই বা যায়-আসে? পাঠ্যবইয়ের নিচে আমরা যে ঘুরে বেড়াচ্ছি কখনো চীন, কখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন, কখনো বা কৃষ্ণদ্বীপের রহস্য উন্মোচন করতে। সঙ্গে নিয়ে যেতাম ক্যাপ্টেন হ্যাডক আর ছোট্ট তুষারের দলার মতো পোষা কুকুর কুট্টুসকে।

সবাই যে টিনটিনের সঙ্গে দুঃসাহসী অভিযানে নামতাম, তাই শুধু নয়, কেউ কেউ টিনটিনের সহজ গোলগাল চেহারাকে প্রতিস্থাপন করতাম নিজেদের চেহারায়। বিশ^ব্যাপী অসংখ্য কিশোরদের মনে এভাবেই দাগ কেটে গেছে টিনটিন যুগ যুগ ধরে। কিন্তু টিনটিনের স্রষ্টা আর্জে কীভাবে দেখতেন টিনটিনকে? টিনটিনের বন্ধুদের সঙ্গে আর্জের নিজের যোগসূত্র কী? আর পরবর্তী সময় কোন চরিত্রগুলো সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছে টিনটিন? টিনটিন ভক্তদের জন্য সুখবর, এই লেখায় আমরা তা-ই জানব।

টিনটিনকে আর্জে দেখতেন একটা বয় স্কাউট হিসেবে। এ জন্যই তেপ্পান্ন বছর ধরে প্রকাশিত ২৪টি বইয়ে টিনটিনের বয়স থাকে একই। টিনটিন সারা বিশ্বে সমাদৃত হলেও, আমেরিকায় টিনটিন পরিচিত ছিল না মোটেও। আমেরিকায় তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সুপারম্যান, ব্যাটম্যানেরা। টিনটিনের হাত দিয়ে জাল ছোড়া কিংবা ওড়ার মতো অতিমানবিক শক্তি না থাকলেও, টিনটিনের মধ্যে বয়স্কাউটের সব গুণাবলি নম্রতা, জ্ঞান, অনুসন্ধিৎসা উপস্থিত থাকায় পৃথিবীব্যাপী অসংখ্য কিশোরের রোল মডেল হয়ে ওঠে টিনটিন।

জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার ফ্রানসাইজ ইন্ডিয়ানা জোনসের চরিত্রের মূল অনুপ্রেরণাও ছিল টিনটিনই। এমনকি ইন্ডিয়ানা জোনসের অনেক দৃশ্য তো সরাসরি টিনটিনের কমিক স্ট্রিপ থেকেই নেওয়া। জুরাসিক পার্ক, জওজের মতো বিশ্বনন্দিত সিনেমার পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের ইচ্ছা ছিল টিনটিনকে সিনেমার রিলে আনতে। প্রথমদিকে আর্জে টিনটিনের প্রথম কয়েকটা অ্যাডাপ্টেশনের ব্যর্থতা দেখে টিনটিনকে নতুনভাবে পর্দায় আনতে ছিলেন অনিচ্ছুক। কিন্তু স্পিলবার্গ নিজের দক্ষতা যখন ইন্ডিয়া জোনস অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় আর্কিওলজিস্ট, যে কিনা ধরতে গেলে টিনটিনের প্রাপ্তবয়স্ক ভার্সনের মাধ্যমে দেখিয়েই দিলেন, আর্জে তখন নিশ্চিত হয়ে গেলেন, স্পিলবার্গের চেয়ে ভালোভাবে টিনটিনকে কেউ পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারবেন না। এরই ফসল ২০১১ সালে প্রকাশিত দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অব টিনটিন সিনেমাটি। ভক্তদের মতে, সিনেমাটি অনেক দিক দিয়েই সুবিচার করেছে আর্জের সৃষ্টির সঙ্গে।

আর্জের লেখনী এবং টিনটিন সিরিজের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব আছে যার, সে হচ্ছে আর্জের বন্ধু চায়নিজ ভাস্কর বন্ধু চ্যাং, যাকে হার্জে তার মেন্টর বলেও মানতেন। টিনটিনের প্রথম তিনটি কমিক বই ঐতিহাসিকভাবে, বিশেষ করে সোভিয়েতের আর কঙ্গোকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার জন্য সমালোচিত। ‘দ্য ব্লু লোটাস’-টিনটিনের চায়নায় অভিযান থেকেই কাহিনি এবং অঙ্কনেও বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এরপরের অভিযানগুলোয় আর্জে অনেকখানিই নিখুঁত বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। উল্লেখ্য, তিব্বতে টিনটিন আর দ্য ব্লু লোটাসের চরিত্র চ্যাং আক্ষরিক অর্থেই হার্জের বন্ধু চ্যাং-ই।