দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে আগামীকাল রবিবার সারা দেশে সাধারণ ছুটি। এর আগে গতকাল শুক্র ও আজ শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় টানা তিন দিনের ছুটি পেয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এ সুযোগে ঢাকার বাসিন্দাদের অনেকেই ঢাকা ছেড়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে বাড়িতে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে গেলেও একটি অংশ ছুটি কাটাতেই বাড়ি ফিরছেন। অথবা ব্যক্তিগত কাজ সারতে বিভিন্ন স্থানে ছুটছেন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক সরকারি চাকরিজীবী টানা তিন দিনের ছুটির সঙ্গে ছুটি বাড়িয়ে নিয়েছেন। ১-২ দিনের ছুটি বাড়িয়ে টানা ছুটিতে বাড়ি ফিরেছেন অনেকে।
আজ রাত সাড়ে ৭টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে কথা হয় পঞ্চগড়ের বাসিন্দা হাসান মাহমুদের সঙ্গে। তিনি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। হাসান মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৩ দিনের ছুটি পাওয়ায় পঞ্চগড় যাচ্ছি। ভোট দিতে যাচ্ছেন কী না এমন এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি পঞ্চগড়-২ আসনে (দেবীগঞ্জ ও বোদা উপজেলা)। আমাদের এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। তার শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তিনি এমনিতেই জিতবেন ফলে ভোট দিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি এলাকায় গেলেও ভোট দেব না, শীতের পিঠা খেতেই বাসায় যাওয়া।’
একই স্টেশনে কথা হয় রংপুরের বাসিন্দা শারমিনের সঙ্গে। তিনি রংপুর শহরের মডার্ণ এলাকার বাসিন্দা। তার এলাকায় এবার নির্বাচন করছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। শারমীন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পরীক্ষা দিতে ঢাকা এসেছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত নির্বাচনের সময় বয়স ১৮ হয়নি তাই এবারই প্রথম ভোট দেওয়ার কথা। কিন্ত আমার আসনে তো নির্বাচন আছে কী না সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। নির্বাচনে যদি কারো জয় পরাজয় নিশ্চিত হয়েই থাকে তাহলে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে লাভ কী? আমি ভোট দিতে যাব না।’
ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামীকাল রবিবার সকাল ৮টায় শুরু হবে ব্যালটে ভোটগ্রহণ। বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষ হবে। তবে কেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের লাইন থাকলে ভোট শেষ হতে আরো দেরি হতে পারে। অর্থাৎ যারা ভোট দিতে আসবেন, তাদের ভোট দেওয়া শেষ হলেই ভোট বন্ধ হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
রাজধানী ঢাকায় যারা বসবাস করেন তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ ভাগ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোটার। দ্বাদশ নির্বাচনে বিএনপিসহ তাদের মিত্র হিসেবে পরিচিত দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় অনেকেই এই ভোট নিয়ে আগ্রহী নয়। এবারের নির্বাচনে নবীন ভোটার প্রায় এক কোটি। ভোটের মাঠে বিরোধী দল বিএনপি না থাকায় রাজনীতিতে আগের সেই উত্তাপ নেই ফলে রাজনীতি থেকে দূরে থাকছে তরুণদের একটা অংশ। এই তরুণরা ভোট কেন্দ্রে যাবে কী-না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসের কথাই চিন্তা করেন, ছাত্রলীগ ছাড়া আর কারো রাজনীতি করার সুযোগ নেই। আমার বাবা দাদা সবাই আওয়ামী লীগ করেন। ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল কিন্ত রাজনীতিতে কোনো প্রতিযোগিতা নেই, ফলে রাজনীতি থেকে দূরে আছি। ভোট দিতে এলাকায় যাচ্ছেন কি-না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভোট কেন্দ্রে গেলে আমি আওয়ামী লীগের প্রার্থীকেই ভোট দিতাম। আমার এলাকা থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান নির্বাচন করছেন। তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই ফলে আমার ভোট দিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।’
ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে কথা হয় নাজমা আক্তার ও তার স্বামী জুবায়েরের সঙ্গে। ভোট দিতে এলাকায় যাচ্ছেন কী না এমন প্রশ্নে নাজমা বলেন, ‘ভোট দেওয়ার প্রয়োজন কী, আমার ভোট আমি না গেলেও অন্য কেউ দিয়ে ফেলবে। তাই আমি ভোট দিতে নয় ভোটের ছুটিতে এলাকায় যাচ্ছি।’ তবে তার স্বামী জুবায়ের ভোট দিতে যেতে পারেন বলে জানান তিনি।
তবে ব্যতিক্রমী চিত্র ও দেখা গেছে। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বাসিন্দা জুনেদ আহমেদ শনিবার ঢাকা ছেড়ে এলাকায় যাচ্ছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার এলাকায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে লড়াই জমে উঠবে। তাই আমি যেনো ভোট দিতে বাড়ি যাই সেই ব্যবস্থা করছেন এক প্রার্থী।’
ভোটের দিন নানা কারণে নিজ নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারছেন না এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তাদেরই একজন রংপুরের গঙ্গাচড়া এলাকার বাসিন্দা খোকন মিয়া। ভোট দিতে যাবেন কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি রিকশা চালাই, চাকা ঘুরলে টাকা আসবে, না হলে খাবো কী। ইচ্ছে ছিল এলাকায় গিয়ে ভোট দেওয়ার কিন্ত যেতে আসতে যে খরচ হবে তা পাবো কই। আমার এলাকায় ৩ জন প্রার্থী আছেন। তাদের মধ্যে লড়াই জমছে।’
ইসির প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় দেখা গেছে, এবার সারা দেশে ভোটারের সংখ্যা ১১ কোটি ৯৬ লাখ। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৭৬ লাখ ও নারী ভোটার ৫ কোটি ৮৯ লাখ। আর ট্রান্সজেন্ডার ভোটার ৮৪৯ জন। এর মধ্যে ১ কোটি ৫৪ লাখ নতুন ভোটার। যারা প্রথমবার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
এদিকে ই-ভোটিং কবে চালু করা যাবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হাবিবুল আউয়াল। গত ১২ নভেম্বর ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ বিডি’ চালু করার সময় প্রবাসী বাংলাদেশিসহ নিজ এলাকার বাইরে বসবাসকারী ভোটারদের ব্যাপক আগ্রহের কথা তুলে ধরে কবে নাগাদ ই-ভোটিং চালু সম্ভব হবে জানতে চেয়েছিলেন একজন প্রার্থী।
উত্তরের সিইসি বলেছিলেন, ‘এখনই ই-ভোটিং সম্ভব হবে না। পোস্টাল ভোটিং তো চালু রয়েছে। ঘরে বসে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা এখনও পৃথিবীর কোথাও চালু হয়নি। তবে ভারত চেষ্টা করছে ঘরে বসে মোবাইলের মাধ্যমে অনলাইনে ভোট নেওয়া যায় কি না সেই ব্যবস্থা করতে। ভারত সফল হলে আমরাও প্রবর্তন করতে পারব। তবে কবে চালু হবে তার নিশ্চয়তা এখন দিতে পারছি না।’
গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টায় শেষ হয়েছে ভোটের প্রচার প্রচারণা। এর পর থেকেই মূলত অপেক্ষা শুরু। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ করতে কোনো কিছুর কমতি রাখছে না আউয়াল কমিশন। এবারের নির্বাচনে ‘ভোটার উপস্থিতি’ নিশ্চিত করাই বর্তমান কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জানুয়ারি ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নওগাঁ-২ আসনে একজন প্রার্থী মারা যাওয়ায় ওই আসনের ভোট বাতিল করেছে ইসি। যদিও গতকাল শুক্রবার রাতে গাইবান্ধা-৫ আসনে ইসি ভোট বন্ধ ঘোষণা করেছে বলে গুঞ্জন ওঠে। পরে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানান।
দ্বাদশ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে এক হাজার ৯৭০ প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। ২৮টি রাজনৈতিক দলের হয়ে লড়াই করছেন এক হাজার ৫৩৪ প্রার্থী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন ৪৩৬ জন।