লালমনিরহাটের তিনটি সংসদীয় আসনই একসময় জাতীয় পার্টির (জাপা) দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর সেই দুর্গ ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সুবাদে এই দুর্গে এখন ঘাঁটি গেড়েছে আওয়ামী লীগ। জেলার জাতীয় পার্টি সম্পর্কে এমনই মূল্যায়ন দলের একসময়ের কর্মী আদিতমারী উপজেলা সদরের বাসিন্দা লুৎফর রহমান মুকুলের। শুধু তিনিই নন জাতীয় পার্টির কর্মীরা এখন হতাশ হয়ে বিভিন্ন দলে ভিড়েছেন। তাদের মতে, দুর্গেই এখন দুর্গতিতে পড়েছে জাতীয় পার্টি।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থন হারানোয় জেলায় জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে। এবারের ভোটে জেলার একটি আসনেও জাপাকে ছাড় দেয়নি আওয়ামী লীগ। তাই আজ রবিবারের ভোটে তিন আসনেই জাপার ভরাডুবি দেখছেন তারা। তিনটিতেই আওয়ামী লীগের নৌকা অথবা দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়া অনেকটা সময়ের ব্যাপার।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসনে প্রথমে জাপার প্রার্থী দেওয়া হলেও পরে প্রত্যাহার করা হয়। এ আসনে নৌকার প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোতাহার হোসেন। তার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থবিষয়ক উপকমিটির সদস্য আতাউর রহমানের।
লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসনটি দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে হাতছাড়া হওয়ার পর আর উদ্ধার করতে পারেনি জাপা। আসনটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী দলের জেলা সহসভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন প্রচারণায় সাড়া জাগাতে পারেননি। এ আসনের বর্তমান সাংসদ সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এবারও নৌকা প্রতীক পেয়েছেন। তার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি সিরাজুল হকের।
লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসন থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বরাবরই এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে তিনি ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে এমপি হন। কিন্তু এবার তিনি এ আসনে নির্বাচন করছেন না। এখানে এবার জাপার প্রার্থী জাহিদ হাসান। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান এবং ঈগল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জাবেদ হোসেন। প্রচারণা পুরো সময় মাঠে সরব ছিলেন নৌকার প্রার্থী। ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান ও তার সমর্থকরা। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাবেদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে দেখা না গেলেও ভোটে চোখ রাঙাচ্ছেন তিনি। রাজনীতিতে নবীন জাপার প্রার্থী জাহিদ তেমন সাড়া ফেলতে পারেননি। সাধারণ ভোটারদের ধারণা, এখানে নৌকার সঙ্গে লড়াইটা হবে ঈগলের।
সদর আসনে জাপার প্রার্থী জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এর আগে জাতীয় পার্টি কয়েক বছর ধরেই আগলে রেখেছিল আসনটি। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং পার্টির চেয়ারম্যানের অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করতে ভোটাররা আবারও জাতীয় পার্টিকেই বেছে নেবেন বলে আমার বিশ্বাস।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী জাবেদ বলেন, ‘বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। তাই এ আসনের ভোটারদের প্রতি আমার আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে।’
নৌকার প্রার্থী মতিয়ার বলেন, ‘ভোটাররা দীর্ঘদিন নৌকায় ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তাই এবার ভোটবিপ্লব হবে।’