নির্বাচন যথাসময়ে সম্পন্ন হয়েছে, এটাই স্বস্তির। কারণ, নির্বাচনের আগে বেশ কয়েকটি জেলায় ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। তবে গতকাল দেশব্যাপী বিভিন্ন নির্বাচন কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে মাত্রায় অবনতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটুকু হয়নি।
ঢাকার মিরপুরের দারুস সালাম এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভোট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভোটের পরিস্থিতি নিয়ে ৩ বিদেশি পর্যবেক্ষকের মধ্যে ডেপুটি হেড অব মিশন ইউএস এসটিও টেরি এল. ইসলে বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ ভালো। মানুষ ভোট দিতে আসছে। সবকিছু ভালো মনে হয়েছে। আশা করছি, শতকরা ৫০ ভাগ ভোট পড়বে।’ তবে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. জাহাংগীর আলম। তবে শেষ পর্যন্ত ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল।
এটা সত্যি, ভোটগ্রহণ সর্বত্র নির্বিঘœ ছিল না। কোথাও কোথাও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার খবর জানা গেছে। নরসিংদী-৪ (বেলাব-মনোহরদী) আসনের একটি কেন্দ্রে ১২টি ব্যালট বই ছিনিয়ে নিয়ে নৌকা প্রতীকে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-খুলশী-পাহাড়তলী) আসনের পাহাড়তলী কলেজ কেন্দ্রে দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় ২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দুজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। কোথাও কোথাও জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে সহিংসতায় প্রাণ গেছে ১ জনের। অনিয়ম ও সহিংসতার কারণে ৭টি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করা হয়েছে। নরসিংদীতে জাল ভোট দিতে গিয়ে ধরা পড়েছেন শিল্পমন্ত্রীর ছেলে। আওয়ামী লীগের ‘ডামি’ নির্বাচনে জনগণের ভোট বর্জন ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে থাকবে মন্তব্য করে ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বলেছেন, আওয়ামী লীগের এখনই নাকে খত দিয়ে পদত্যাগ করা উচিত। কারণ জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। দেশের মানুষ এই জালিম সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে। তাই জনগণের নীরব ‘ভোট প্রত্যাখ্যান’ জাতির বিজয় এবং ফ্যাসিবাদ সরকারের পরাজয়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘আমাদের আন্দোলন চলছে, চলবে। দেশবাসীকে আজকের (গতকাল) হরতাল সফল করার আহ্বান জানাই। আজ একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে কোনো ভোটার নেই।’ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত চেষ্টা করেছে ভোটকে ঘিরে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া উৎসাহ-উদ্দীপনাকে ম্লান করার জন্য। কিন্তু তাদের অপচেষ্টা ছাপিয়ে ভোট মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা আর উচ্ছ্বাসে পরিণত হয়েছে। যদিও সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি হচ্ছে জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ৪ প্রার্থী। আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন ৭ জন। সারা দেশের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৯৪টি কেন্দ্রে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব কেন্দ্র থেকে কমপক্ষে ১৫ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সত্যিকার অর্থে ভোটার উপস্থিতি যে পরিমাণে আশা করা হয়েছিল, তা হয়নি। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমেই গঠিত হবে সরকার। এরপরও নির্বাচনে যে দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে, তাদের ওপর দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা। সেখানে টেকনোক্র্যাট কোটায়ও কেউ মন্ত্রী হবেন। এটা ভবিষ্যতের বিষয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী? নতুন সরকার এই মুহূর্তে কোন কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হবে, সেটাই আসল প্রশ্ন। একইসঙ্গে নির্বাচনপরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে, জনমনে স্বস্তি নিয়ে আসার দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করব, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে, জনগণের দুঃখ-দুর্ভোগ লাঘবে নিজ দায়িত্ব পালন করবেন এটাই প্রত্যাশা। মনে রাখতে হবে, এখন সময় এগিয়ে যাওয়ার।