চাঁদের পর সূর্য। ফের সাফল্যের পলক ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর মুকুটে। ইসরোর সৌর পর্যবেক্ষণ মিশন আদিত্য-এল১। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার। আদিত্য এল১ স্যাটেলাইটটি এই চার মাসে প্রায় দেড় মিলিয়ন কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে শনিবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সূর্যের কক্ষপথে ঢুকে পড়ে। এই নির্দিষ্ট কক্ষপথেই আগামী পাঁচ বছর থাকবে আদিত্য-এল১।
সূর্যের বাইরের স্তরগুলো পরিমাপ এবং পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন সুপার সেনসেটিভ যন্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে এটিকে। আদিত্য এল-১-এর নির্দিষ্ট গন্তব্যে প্রতিস্থাপনের পর ইসরো চেয়ারম্যান এস সোমনাথ বলেন, সৌর মিশন, আদিত্য-এল১ কেবল ভারতের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের। সূর্য সম্পর্কে আমাদের সকল বিজ্ঞানীদের ভাবনা বুঝতে এটি সাহায্য করবে।
২ সেপ্টেম্বর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের হরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় আদিত্যকে। তিন সেপ্টেম্বর প্রথমবার কক্ষপথ বদলেছিল সৌরযানটি। এরপর একে একে পাঁচবার কক্ষপথ বদলে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ কাটিয়ে পাড়ি দিয়ে সূর্যের চূড়ান্ত কক্ষপথে পৌঁছে গেল আদিত্য।
চার মাসের দীর্ঘ যাত্রার সফল এ সূচনা সাম্প্রতিক মহাকাশ অনুসন্ধানে সাধনার সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত। শনিবার রাতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, সবচেয়ে জটিল কিছু মহাকাশ মিশন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আমাদের বিজ্ঞানীদের অভূতপূর্ব প্রতিশ্রুতি তাদেরই অধ্যবসায়ের প্রমাণ। তাদের হাত ধরেই ভারত মহাকাশে আরেকটি মাইলফলক স্থাপন করেছে।
বর্তমানে মহাকাশযানটি নিজের ল্যাগ্রঞ্জ পয়েন্ট১-এ অবস্থান করেছে। ল্যাগ্রঞ্জ পয়েন্ট১ হলো পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে পাঁচটি অবস্থানের মধ্যে একটি যেখানে সূর্য এবং পৃথিবীর মহাকর্ষীয় শক্তি একে অপরের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখে। এল১ এই পাঁচটি অবস্থানের মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল স্থান। আদিত্য এই এল১ পয়েন্টে পৌঁছেছে। সেখান থেকে এটি সূর্যের বিস্তৃত অধ্যয়ন করবে। সৌর বিকীরণ এবং মহাকাশ আবহাওয়ার ওপর এর প্রভাবের উপর দৃষ্টি নিবন্ধ করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করবে।
আদিত্য-এল-১ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হলো কক্ষপথে উপগ্রহের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার ওপর সৌর বিকিরণের প্রভাব সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করা, বিশেষ করে ইলন মাস্কের স্টারলিংক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মতো উদ্যোগগুলো প্রভাবিত করে এমন ঘটনাগুলোর ওপর বিশেষ ফোকাস করা।
ইসরোর প্রাক্তন বিজ্ঞানী মনীশ পুরোহিত সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমাদের অবশ্যই সূর্য সম্পর্কে আরও জানতে হবে, কারণ এটি মহাকাশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সূর্য আমাদের পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্র। এটি প্রচুর শক্তি নির্গত করে। সৌর শিখাও বাড়তে থাকে। তাদের অগ্নিশিখা পৃথিবীর দিকে ঘুরলে মহাকাশযান, স্যাটেলাইট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আদিত্য এল১ এ ধরনের সৌর ইভেন্ট সম্পর্কে সময়মত তথ্য প্রদান করবে, যাতে ক্ষতি কমানো যায়।’
মিশনে আদিত্য এল১ কি করবে?
এখন পর্যন্ত ইসরো স্থল-ভিত্তিক টেলিস্কোপের মাধ্যমে সূর্য অধ্যয়ন করত, কিন্তু এটি সূর্যের বায়ুমণ্ডলকে গভীরভাবে প্রকাশ করেনি। এর বাইরের স্তর, করোনা, কেন এত গরম এবং এর তাপমাত্রা কী তা জানা যায়নি। তবে আদিত্যের সাথে যে সরঞ্জামগুলো গিয়েছিল তা এই বিষয়ে আলোকপাত করবে।
করোনাগ্রাফ: এটি একটি টেলিস্কোপ, যা 24 ঘন্টা সূর্যের করোনার উপর নজর রাখবে এবং প্রতিদিন ১৪৪০ টি ছবি পাঠাবে। সোলার আল্ট্রাভায়োলেট ইমেজিং টেলিস্কোপ: এটি সূর্যের আলোকমণ্ডল এবং ক্রোমোস্ফিয়ারের ছবি নেবে। সোলেক্সস এবং হেল১০এস : সূর্যের এক্স-রে অধ্যয়ন করবে।
অ্যাসপেক্স এবং প্লাজমা বিশ্লেষক: সৌর বায়ু অধ্যয়ন করবে এবং তাদের শক্তি ব্যাখ্যা করবে।
ম্যাগনেটোমিটার: এল১ পয়েন্টের চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্র পরিমাপ করবে।