পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে

পাইলটের মৃত্যু, ইউনাইটেড হাসপাতালের গাফিলতি ও গালফ এয়ারের অসহযোগিতা

গালফ এয়ারের পাইলট ক্যাপ্টেন মোহান্নাদ আল হিন্দির মৃত্যু নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রতিবেদনে ইউনাইটেড হাসপাতালের গাফিলতি ও গালফ এয়ারের অসহযোগিতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি পরিবারের হাতে আসলে মঙ্গলবার এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছেন প্রয়াত পাইলট মোহান্নাদ আল হিন্দির বোন তালা এলহেন্ডি। পিবিআইয়ের তদন্ত গত ২০ নভেম্বর ২০২৩ ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে পিবিআই তাদের এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। 

এতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন মোহান্নাদ আল হিন্দি ডিউটিরত এবং ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের কারণে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে গালফ এয়ার কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসায় বিলম্ব ও সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। 
এ ঘটনায় মোহান্নাদের বোন তালা এলহেন্ডি জোসেফানো ২০২৩ সালের মার্চ মাসে ঢাকার সিএমএম আদালতে ইউনাইটেড হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের চীফ কনসালটেন্ট ডা. মো. ওমর ফারুককে অভিযুক্ত করে অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কলেজকে (বিএমডিসি) ঘটনাটি তদন্ত করতে এবং উপরোক্ত বিষয়ে তাদের আলাদা আলাদা করে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেন। 
পিবিআই তদন্তকারী কর্মকর্তা তার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, ডা. মো. ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকার কারণে অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি। প্রতিবেদনটির কপি হাতে পেয়েছে নিহতের পরিবার। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে ভোর ৪.৩৫টা থেকে ৮টা পর্যন্ত রোগী আইসিইউ চিকিৎসক ডা. সালাহ উদ্দিন এবং জুনিয়র কার্ডিওলজিস্ট ডা. তুনাজ্জিনা আফরিনের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। 

এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আরো নিশ্চিত করা যাচ্ছে যে, সকাল ৯টা ৩০ পর্যন্ত উল্লেখ্য ডা. ফারুক, উক্ত মোহান্নাদ যে তার রোগী ছিলেন এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তদন্তকারী কর্মকর্তা ডা. ফারুখকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কিভাবে তাকে না জানিয়ে একজন রোগীকে তার নামে ভর্তি করা হয়েছিল, কিন্তু এ বিষয়ে ডা. ফারুক উত্তর না দিয়ে বরং প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা, ইউনাইটেড হাসপাতালে অনুপস্থিত আছেন এমন চিকিৎসকদের অধীনে রোগী ভর্তি করার বিষয়ে কোনোরূপ নীতি বা প্রোটোকল আছে কিনা তা জানতে চাইলে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ধরনের কোনো প্রোটোকল দেখাতে পারেনি। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদে হার্টে ৯৯% ব্লকেজ থাকা সত্বেও সকাল ৮টা পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরও ইউনাইটেড হাসপাতালের জুনিয়র কার্ডিওলজিস্ট ডা. তুনাজ্জিনা আফরিন রোগীর হার্টে কোনোরূপ সমস্যা নেই বলে মন্তব্য করেছেন। শুধু তাই নয়, সকাল ৮টায় ডাক্তার আফরিন রোগীর খোঁজ-খবর নিতে সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট বা কোনো পরামর্শককে না জানিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এ সময় তিনি রোগীর পিসিআই প্রয়োজন নেই, যা ভিকটিমের জীবন রক্ষা করতে পারত। পরিবারটি মনে করে, অশুভ শক্তিগুলো ষড়যন্ত্রপূর্বক তাদের কুলক্ষ্য অর্জনে কাজ করেছে এবং ভিকটিমের পরিবার এই কু-প্ররোচনার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সমস্ত আইনি উপায়ে চ্যালেঞ্জ করার এবং উক্ত মোহান্নাদের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।  

ইউনাইটেড হাসপাতাল দাবি করেছে , গালফ এয়ার তাদের রোগীর মেডিকেল হিস্ট্রি প্রদান করেনি। তদন্তকারী কর্মকর্তা ইউনাইটেড হাসপাতালের একদল চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যারা দাবি করেছেন যে, মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো প্রাথমিকভাবে সমস্যা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যারা ভিকটিমকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল তার মেডিকেল হিস্ট্রি প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছিল। গালফ এয়ার কান্ট্রি ম্যানেজার ঈসা শাহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে মৃত ব্যক্তির মেডিকেল রেকর্ড প্রদান করতে অস্বীকার করেছিল এবং আজ অবধি তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও গালফ এয়ার, কো-পাইলট খলিল আবদুর রাজ্জাককে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য উপস্থিত করতে অস্বীকৃতি জানায়। 
সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অফ বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রতিবেদন

তদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিষয়টি নিয়ে কোনো তদন্ত করেনি বা সিসিটিভি ফুটেজ ও সংরক্ষণ করেনি। সেই সাথে হাইকোর্টের আদেশ সত্ত্বেও তারা একটি বিদেশী এয়ারলাইন্সের বিষয়ে তদন্ত করতে পারে না এমন অজুহাত দেখিয়ে তা করতে অস্বীকার করেছিল বলে জানান মৃতের পরিবার। মৃতের পরিবার সন্দেহ করে যে, বেবিচক কর্মকর্তারা গালফ এয়ারের স্বার্থ রক্ষা করতে মরিয়া।   

বিএমডিসি এবং ডিজিএইচএস সম্পর্কে তদন্তের ফলাফল
তদন্ত রিপোর্টে আরো উঠে এসেছে যে, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্বেও বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ইউনাইটেড হাসপাতাল গালফ এয়ারের পাইলটের মৃত্যুতে অবহেলা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে আজ অবধি কোনো উত্তর দেয়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তা বিএমডিসি কর্তৃপক্ষের কাছে রোগীকে কোনো চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে তার অধীনে ভর্তি করা সম্ভব কিনা এবং ওই রোগীকে সকাল আনুমানিক  ৫টায় ভর্তি করা সত্ত্বেও পিসিআই আরো দেরিতে তথা সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে করা হয়েছিল এবং চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছে কিনা। এ বিষয়েও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) কোনো উত্তর দেয়নি।
   
পরিবারের মতামত 
তদন্ত প্রতিবেদনে যথেষ্ট প্রমাণ উন্মোচিত হওয়া সত্ত্বেও, কোনও অপরাধ প্রমাণিত হয়নি বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তাতে মৃত ভিকটিমের পরিবার হতাশ ও মর্মাহত। তবে মৃতের পরিবার জানতে পেরেছে যে, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং তার পরিবারকে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বারবার, যা উক্ত মোহান্নাদের মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের ক্ষেত্রে বাধা ও অবৈধ হস্তক্ষেপ সৃষ্টি করেছে। 

পরিবারটি ধারণা করেন যে, গালফ এয়ার এবং ইউনাইটেড হাসপাতাল মোহান্নাদের মৃত্যুতে তাদের দোষ ঢাকতে একসাথে কাজ করছে। যতদিন না মৃত ভিকটিম তথা মোহান্নাদের আকস্মিক মৃত্যুতে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হয়, ততদিন তার পরিবার তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে চায়। তারা আরো উল্লেখ্য করেন যে, ভিকটিমের মৃত্যুতে জড়িত অপরাধী তথা যেসকল ডাক্তাররা চিকিৎসা জনিত অবহেলায় জড়িত তারা জেলে না যাওয়া পর্যন্ত এবং দায়ী গালফ এয়ার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চালিয়ে যাবেন।