ফুলের চাপায় 'পিষ্ট' পাপন

২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জাহিদ আহসান রাসেলকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হলে ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ স্বস্তি পেয়েছিল এই ভেবে যে, খেলার মানুষকেই দেওয়া হয়েছে দায়িত্ব। প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পাওয়ার আগের ১০ বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করায় এই অঙ্গনে তিনি ছিলেন পরিচিত। তাই বলে রবিবার নাজমুল হাসান পাপনকে নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে যা ঘটল, সে রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি রাসেলকে।

৩৩ বছর পর পূর্ণমন্ত্রী পাওয়ার আনন্দে পাপন বরণের নামে কান্ডজ্ঞানহীন আচরণ করতে শুরু করলেন ফেডারেশনের কর্তারা। তাদের ফুলেল শুভেচ্ছা বরণ করতে গিয়ে রীতিমতো হাঁফিয়ে উঠতে হয়েছে পাপনকে। একটা সময় বিরক্ত হয়ে ফুলবরণ স্থলও ছেড়ে যান তিনি। পরে অবশ্য দীর্ঘ সময় সংবাদমাধ্যমের অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তবে শেষ কথাতেই পরিষ্কার, ফেডারেশন কর্তাদের বরণের নামে অরাজক পরিস্থিতি মোটেও পছন্দ হয়নি নয়া ক্রীড়ামন্ত্রীর। ভবিষ্যতে যাতে এ রকমটা না হয় তা নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন তিনি।

মন্ত্রী হিসেবে রবিবার ছিল পাপনের প্রথম কর্মদিবস। দিনের প্রথমার্ধ তিনি কাটিয়েছেন মন্ত্রণালয়ে। সেখানেও এক প্রস্থ ফুলেল শুভেচ্ছাবরণ করতে হয়েছে তাকে। মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করে বেলা আড়াইটার দিকে তিনি আসেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে। পদাধিকার বলে ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান এখন তিনি। আর ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো সরাসরি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধীন। তাই মন্ত্রী হিসেবে প্রথম ক্রীড়া পরিষদে পা রাখার আগেই সেখানে হাজির সব ক্রীড়াঙ্গন। কে কার আগে ফুল দেবেন, পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবেন, মন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দন করবেন- এমন অনেক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের কর্তারা।

অথচ একটা নিয়মের মধ্যে ফুল দেওয়ার পর্বটি সাজাতে চেয়েছিল ক্রীড়া পরিষদ। সচিব পরিমল সিংহ একটা  তালিকাও করেছিলেন। তবে সেই তালিকা অগ্রাহ্য করে পাপনের সান্নিধ্য পেতে রীতিমতো ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে ফুল গ্রহণ বন্ধ করে নিজ কক্ষে চলে যান ক্রীড়ামন্ত্রী। সেখানেও নিস্তার পাননি। অনেকেই পিছু পিছু তার কক্ষে গিয়ে ফুল দিয়ে এসেছেন। এরপর তিনি অংশ নেন সংবাদ সম্মেলনে। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর থেকেই কথা বলে চলেছেন পাপন।

সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হাসান পাপন। ছবি: দেশ রূপান্তর

রবিবারও সে কথাগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। নতুনের মধ্যে তিনি যেটা বলেছেন, তাতে ক্রীড়াপ্রেমীরা আশ্বস্ত হতেই পারেন। পাপন মাঠ সংকটকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন। সেটা নিরসনে সবার জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠ গড়ার কথা বলেছেন।

সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্টেডিয়ামের চেয়ে তিনি সব সময় উন্মুক্ত মাঠের পক্ষে, ‘আমি কিন্তু স্টেডিয়ামের পক্ষে না। আমি সব সময় খেলার মাঠের পক্ষে। আমাদের খেলার মাঠের খুব অভাব। স্টেডিয়ামের অভাব যে নেই তা নয়। তবে সব জায়গায় স্টেডিয়ামের কোনো দরকার নেই। আমাদের দরকার একটা খেলার মাঠ। এর সঙ্গে দুইটা ড্রেসিং রুম, চেঞ্জিং রুম, আর বড়জোর একটা অফিসকক্ষ। সেটাতে বাউন্ডারি ওয়াল থাকুক কিংবা না থাকুক, মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে।’

ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির অভিজ্ঞতা থেকে পাপন আরও বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো, একটা স্টেডিয়াম করার পর দেখা যায় সেটা তালা মারা থাকে। এটার মধ্যে ঢুকতেই পারছে না বাচ্চারা। তাহলে ওরা খেলবে কোথায়? ওখানে বছরে একটা টুর্নামেন্ট হয়। সেটা কেবল টুর্নামেন্টের সময় খোলা হয়। এ রকম হলে তো আমার স্টেডিয়াম করে কোনো লাভ নেই। আবার অনেকে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম করতে চায়। আন্তর্জাতিক মানের করতে হলে অনেকগুলো শর্ত মানতে হয়। আমাদের বেশ কয়েকটা আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম আছে। অথচ সেখানে আমরা খেলা চালাই না। কারণ আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামের অন্যতম শর্ত পাঁচ তারকা মানের আবাসনব্যবস্থা আশপাশে থাকতে হবে। ট্রাভেলিং টাইম ৪০ মিনিটের বেশির করা যাবে না। কেবল স্টেডিয়াম করলেই হয় না। এর দেখভালের খরচ কে জোগাবে? সব ফেডারেশনের তো সেই সক্ষমতা নেই। আবার সব যদি আমরা চাই, মন্ত্রণালয় বা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ করে দেবে, সেটা তো সম্ভব নয়। নাই নাই করেও কতগুলো স্টেডিয়াম আছে দেশে জানেন? অনেকগুলো। প্রথমত, দেখতে হবে কতগুলোয় খেলা হয়, কতগুলোয় হয় না? দ্বিতীয়ত, দেখতে হবে সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত কি না। যদি না হয়, আমাদের তো সবার জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠ লাগবে।’

পাপন আগের মেয়াদের প্রতিমন্ত্রী রাসেলের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘রাসেল থাকাবস্থায় যে পরিমাণ কাজ করেছে। আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। অনেক কিছুই সে করেছে, যেটা নাকি আমি আগে দেখিনি। হ্যাঁ, যেহেতু ক্রিকেট স্বাধীনভাবে চলছে, তাই সেদিকে তার নজর একটু কম ছিল। এটা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আর সরকার আর বিসিবির মধ্যে দূরত্ব বলতে কিছু নেই।’

যেসব খেলা ভালো করছে, তাদের আরও একটু এগিয়ে নেওয়া এবং যাদের সম্ভাবনা আছে, তাদের বেশি বেশি সমর্থনের কথা বলেছেন ক্রীড়ামন্ত্রী। তার আগে সব ফেডারেশনের কথা তিনি শুনবেন আলাদা আলাদা করে। এরপর সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তার চেষ্টা করবেন। তবে যেসব খেলায় সেভাবে কোনো সম্ভাবনা নেই, তাদের প্রয়োজনে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন পাপন।