সরকার ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যক্রম ঘোষণা করেছে। বইয়ের বিরোধিতায় এবারে অভিভাবকরা অত্যন্ত সবাক ও সোচ্চার। সমালোচনায় গণমাধ্যম ভরে উঠেছে।
আমি পরের মুখে ঝাল খেতে অভ্যস্ত নই। তাই, সেই সমালোচনাগুলো পাশে রেখে এবারের পাঠ্যপুস্তক আমার কেমন লেগেছে সেই ভাবনা বিনিময় করতে চাই।
ছেলে আমার ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন বই পেয়েছে। তাই নতুন বছরের বাংলা বই হাতে নিয়ে খানিকটা উল্টে পাল্টে দেখলাম। বিগত বছরের তিন ধরনের বাংলা বইয়ের (আনন্দপাঠ, ব্যাকরণ ও চারুপাঠ) পরিবর্তে এবারে একটিই বাংলা বই। বইয়ের প্রথম অধ্যায়টি হলো ‘মর্যাদা বজায় রেখে যোগাযোগ করি’, যার প্রথম অনুচ্ছেদ ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগাযোগ’। এই অধ্যায়ে প্রথম চার পাতায় ৬টি পরিস্থিতির সংলাপবিহীন দৃশ্য রয়েছে। যেমন : প্রথম পরিস্থিতি হলো পরিবারের সবাই রাতে একসঙ্গে বসে আলাপ করছে; দ্বিতীয়টি হলো, ছেলেশিশু তার মায়ের সঙ্গে মুচি সাথে আলাপ, তৃতীয়টি হলো কন্যাশিশু তার বাবার সঙ্গে হাসপাতালে অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছে ইত্যাদি।
কী পড়তে হবে তা বুঝতে না পেরে ধাক্কা খেলাম। অভিভাবকদের প্রথম সমালোচনাটি হলো বই কীভাবে পড়ানো হবে, তা দুর্বোধ্য। সত্যিই কি তাই? মাউশির ওয়েবসাইটের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষক নির্দেশিকার শরণাপন্ন হলাম। নির্দেশিকার বর্ণনায় এই অংশটুকু দলগত কাজ। এখানে ছাত্ররাই বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির সংলাপ তৈরি করবে। বইজুড়েই এ ধরনের বিভিন্ন দলগত কাজ রয়েছে। আমাদের সময়ে (ও বিগত ২২ সাল পর্যন্ত) দলগত কাজ কেবল বিজ্ঞানের ব্যবহারিক অংশেই ছিল।
অভিভাবক হিসেবে আমার মনে দ্বিতীয় প্রশ্ন জাগল। শিক্ষক নম্বর কীভাবে দেবেন? নির্দেশিকা অনুযায়ী, কেবল এই অনুচ্ছেদ মূল্যায়নে, ছাত্র নিজের এবং অন্যের প্রয়োজন ও আবেগ বিবেচনায় নিয়ে যোগাযোগ করতে পারে কিনা তার পারদর্শিতা মাপা হবে। যদি ছাত্র অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সময় নিজের চাহিদা প্রকাশ করতে পারে, সেই ছাত্র সাধারণ মানের পারদর্শিতা বিবেচনায় মার্কের পরিবর্তে পাবে চতুর্ভুজ, যদি সে চাহিদা প্রকাশকালে একই সঙ্গে শ্রোতার আগ্রহ, চাহিদা ও আবেগ বিবেচনায় নিতে পারে, তবে উত্তম মানের পারদর্শিতা বিবেচনায় পাবে বৃত্ত, যদি সে চাহিদা প্রকাশকালে আগের দুটির সঙ্গে পরিবেশ-পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে পারে, তবে সর্বোত্তম পারদর্শিতা বিবেচনায় পাবে ত্রিভুজ। মূল্যায়নে ব্যবহারিক সূচকও রয়েছে। যেমন একটি সূচক হলো দলীয় কাজে অংশগ্রহণ করা। একইভাবে যদি শিক্ষার্থী দলের কর্মপরিকল্পনায় অংশগ্রহণ না করলেও নিজের মতো করে কাজে অংশ নেয়, যদি সে দলের কর্মপরিকল্পনায় অংশগ্রহণ না করলেও দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজে অংশ নেয়, যদি শিক্ষার্থী দলের কর্মপরিকল্পনায় অংশগ্রহণসহ নিজের কাজে অংশ নেয়, একইভাবে চতুর্ভুজ, বৃত্ত ও ত্রিভুজ পাবে।
প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ হলো ‘যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিবেচ্য’। এরপর মর্যাদা রেখে যোগাযোযোগের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিত, ছাত্র বইতেই ফাঁকা জায়গায় লিখবে। আমার কাছে এটা দারুণ উদ্যোগ মনে হয়েছে। কারণ, এই উত্তরে স্বাধীন চিন্তার সুযোগ রয়েছে, বইতেই লেখার ব্যাপার থাকায় ছাত্রের খাতার বোঝাও কমল। তবে এক্ষেত্রে বইটি মোটা কাগজের প্রিন্টের হলে টেকসই হতো। এরপর ওই অধ্যায়ে ধীরে ধীরে শেখানো হয়েছে মর্যাদা অনুযায়ী সর্বনাম ও ক্রিয়ার ব্যবহার।
পরের অধ্যায় ‘প্রমিত ভাষা শিখি’। এ অধ্যায়ে একটি ছড়া ও একটি নাটিকার মাধ্যমে ছাত্রদের প্রমিত উচ্চারণ ও শব্দার্থ শেখানো হয়েছে।
দলগত অনুশীলনের পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে অভিনব এবং চমৎকার মনে হয়েছে। কারণ, এতে কোনো ছাত্রই খুব পিছিয়ে পড়বে না। ছাত্রদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হবে, বন্ধুত্ব তৈরি হবে, একা নয় বরং সবাইকে নিয়ে এগোনোর মানসিকতা তৈরি হবে। এবার বইতেই উত্তর লেখার ফলে ছাত্র আলাদা নোটের (নোট বই) বোঝা থেকে মুক্তি পাবে। গ্রেডিং পদ্ধতিতে মার্কিং হওয়ায় ছাত্রকে তার প্রাপ্য মার্কের চেয়ে খুব বেশি খারাপ বা ভালো মার্ক দেওয়ার সুযোগ নেই। বইয়ের বিষয়বস্তু অসাধারণ মনে হয়েছে। যেহেতু, ছাত্রের যোগাযোগ দক্ষতা গড়ে ওঠাই সবচেয়ে জরুরি, তাই তার অবস্থান প্রথম অধ্যায়ে হওয়াই যুক্তিযুক্ত। আমার পুরো শিক্ষাজীবনে কোনো শ্রেণিতেই প্রমিত উচ্চারণ শেখানোর উদ্যোগ ছিল না, জোর ছিল কেবল গল্প বা কবিতা মুখস্থ করানোতে। এবারের বইতে ছাত্রকে কেবল ক্লাসেই নয়, সমাজ থেকেও শিখতে হবে। ছাত্ররা বোধহয় এবার গাইড ব্যবসায়ীসহ সব শিক্ষা ব্যবসায়ীর খপ্পর থেকে মুক্তি পাবে। কারণ স্বাধীন-উত্তর, দলীয় অংশগ্রহণ ইত্যাদির কারণে গাইডের আকার হবে ব্যাপক, যা গাইডের প্রকাশমূল্য বিবেচনায় আর লাভজনক হবে না।
মো. শাহাদাত হোসেন
প্রকৌশলী, অভিভাবক