রাজনৈতিক সংকট, মাঠের বিরোধী দলও আ.লীগ!

সংসদে সম্ভাব্য বিরোধী দল স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা (এমপি) কি মাঠেও বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন? ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কি স্বতন্ত্র এমপিদের সেই সুযোগ করে দিতে যাচ্ছে নানা মহলে এমন আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে।

এমন আলোচনাও রয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা বাদে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের সহায়ক শক্তি হিসেবে মাঠে থাকবেন এ স্বতন্ত্র এমপিরা। ধীরে ধীরে জনআকাক্সক্ষা পূরণ ও জনআস্থা নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠবেন।

ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র এমপিরা নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রার্থীর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আরও বড় পরিসরে এমন কথা বলার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৬২ আসন নিয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছেন স্বতন্ত্র নির্বাচিত এমপিরা। তাদের সবাই যেহেতু আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে এসেছেন, ফলে স্বতন্ত্র এই এমপিদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেটা করা গেলে দেশে রাজনৈতিক সংকট দূর হবে এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি অনেকখানি শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন তিনি।

সভাপতিম-লীর এ সদস্য আরও বলেন, ‘এবারের নির্বাচন এক ধরনের অ্যাসিড টেস্ট ছিল। সফল হওয়ার মধ্য দিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনও অনেকখানি এ মডেলেই হতে পারে।’

গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। নির্বাচিত হয়েছেন ৬১ জন। স্বতন্ত্র অন্যজন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন প্রার্থীও তাদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন।

এ নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশ নেয়নি। সে কারণে নির্বাচন উৎসবমুখর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের দলের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামতে উৎসাহিত করেছেন। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের আরেকটি শক্তির উত্থানে সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

সংসদের বিরোধী দল যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ এসেছে, একই কায়দায় মাঠের বিরোধী দলও কি আওয়ামী লীগই নিয়ন্ত্রণ করবে? আওয়ামী লীগ থেকেই কি বিরোধী দল জন্ম নেবে, এমন আলোচনা বেশ জোরালো হয়ে উঠছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত স্বতন্ত্র ৬২ জন এমপি নিয়ে এমন রাজনৈতিক সংকটের এ বাংলাদেশে জাতীয় স্বার্থে এক ও অভিন্ন থাকার রাজনীতির সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ বাদে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে অন্যতম বড় দুটি রাজনৈতিক দলের উৎপত্তি ক্ষমতায় থেকেই। ফলে এবারও তেমন ঘটনার রাস্তা সৃষ্টি হয়েছে। যদি পেছনে ক্ষমতাসীন দলের সহায়তা পাওয়া যায়। কারণ ৬২ এমপির মূল ঠিকানা আওয়ামী লীগই। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের রাজনীতির চর্চা তাদের দিয়েই শুরু হতে পারে। বাংলাদেশে এ চেষ্টা যদিও বারবার হোঁচট খেয়েছে, ফলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম ধরেই শুরু হতে পারে সেই চেষ্টা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে মডেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং যে পরিমাণ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাতে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর সুযোগ এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ ও বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে বিভেদহীন রাজনীতি চর্চা শুরু হওয়ার সময় এসেছে। এবার ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের বিজয়ী হয়ে আসায় সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সামনে।

তবে এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত এর পক্ষে-বিপক্ষে কিছু বলব না। এটা নিয়ে এখনো কোনো সম্ভাবনাও দেখছি না। সংসদীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দলকে সুপথে রাখার জন্য সংসদে একটা কার্যকর বিরোধী দল রাখা কাক্সিক্ষত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা আলাদা পার্টি করার মতো কিছু দেখছি না। এটা মিডিয়া বা একটা মহলের আলোচনা।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে হয়েছে। গত ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতের রাজনীতি দুর্বল করতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। দলটির নেতাদের দাবি, বিএনপির রাজনীতি ও দলটিকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ। গত দুবার সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব করে আসা জাতীয় পার্টিও (জাপা) সংখ্যালঘু হয়ে নামকাওয়াস্তে সংসদে রয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির উত্থান ঘটানোর উৎকৃষ্ট সময় এখনই।

এদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) প্রগতিশীল মহল বহুবছর ধরে সরকার ও বিরোধী দলে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির নেতৃত্বের আওয়াজ তুলছে। বর্তমানে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এমপিরা যেহেতু সিংহভাগই প্রগতিশীল আওয়ামী আদর্শের, তারাই জাতীয় স্বার্থে এগিয়ে এসে সেই ভূমিকায় নিতে পারেন, এমন কথাও হচ্ছে। তবে এমন আলোচনাও আছে, সিপিবি বা বামপন্থি যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে দীর্ঘদিন আদর্শিক জোটে ছিল, তাদের বিকাশ ঘটেনি। ফলে আওয়ামী লীগের বাইরে স্বতন্ত্র এমপিরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে সফল হবে কি না, তা তর্কসাপেক্ষ।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে এককালের কংগ্রেস নেতা মমতা ব্যানার্জি বিজেপির সহায়তায় ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন। ২০১১ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে দলটি। ওই রাজ্যে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। একসময় কংগ্রেস বিরোধিতা করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত দলটি রাখঢাক না করে ১৯৯৯ ও পরবর্তীকালে বিজেপির সঙ্গে জোট করলেও ২০১১ সাল থেকে এককভাবে রাজ্য শাসন করছে দোর্দণ্ড প্রতাপে। বর্তমানে সারা ভারতে বিজেপি ও সাম্প্রদায়িক শক্তি হঠানোর লড়াইয়ে অন্যতম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তৃণমূল।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা দলও যদি নিজেদের কর্মসূচিতে জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটায়, তাহলে দ্রুততার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা কিংবা জনআস্থা অর্জন করতে পারে।

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের বিরোধিতাকারী শক্তির শূন্যতা কাজে লাগিয়ে ১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সেøাগান দিয়ে সাবেক ছাত্রলীগের কিছু নেতা ও অন্যরা মিলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে শুরুতে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের পর জিয়াউর রহমানের সময় দলটি খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার পাশাপাশি জনপ্রিয়তা হারায়।