ক্ষতিকর উপাদান ছাড়াই মুরগি ও মাছের জন্য খাবার তৈরি করছে নিউ হোপ ফিড মিল বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি চীনা কোম্পানি। নিরাপদ এই খাবারের মধ্যে হারবাল ওষুধ ব্যবহারের ফলে মাছ ও মুরগির নানারকম রোগ-বালাই প্রতিরোধ করা যায় সহজেই।
এর পাশাপাশি বিনামুল্যে খামারিদের প্রশিক্ষণসহ প্রান্তিক মানুষের নানারকম সাহায্য করছে প্রতিষ্ঠানটি। নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে পরীক্ষাগার, যেখানে মুরগির নানারকম রোগ নির্নয় এবং পরামর্শ দেওয়া হয় বিনামূল্যে।
গাজীপুরের শ্রীপুরের ভাংনাহাটি এলাকায় অবস্থিত নিউ হোপ ফিড মিল বাংলাদেশ লিমিটেড এর কারখানাটি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর এর উৎপাদন শুরু হয় ২০০৮ সালে। ৮ দশমিক ২৩ একর এলাকা বিস্তৃত ফিড মিলটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৬ হাজার মেট্রিক টন। বিনিয়োগের পরিমাণ ১২.৩৩ মিলিয়ন ডলার।
১৯৮২ সালে চীনে যাত্রা শুরু হয় নিউ হোপের। কৃষি ও পশুপালনে চীনের বৃহৎ এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর,মিশরসহ বিশ্বের ২০টির বেশি দেশে ব¨বসা পরিচালনা করছে। সবমিলে নিউ হোপের কর্মী সংখ্যা ৮২ হাজার।
বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট হি কোয়ান শুই বলেন, নিউ হোপসহ বাংলাদেশে আমাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে চারটি। এই প্রতিষ্ঠানে বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ফিড উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পণ্যের গুনগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা আপোষহীন। এর ফলে ক্রমেই ব্যবসার প্রসার হচ্ছে।
তিনি বলেন, খামারিদের চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে অধিক লাভ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফিড তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের উপাদানের সাথে এক ধরনের হারবাল ওষুধ ব্যবহার করার ফলে মুরগির অন্ত্র ভালো থাকে, বিষ্ঠা থাকে স্বাভাবিক। ডায়রিয়া, বদহজমসহ অন্যান্য অসুখ নিয়ন্ত্রণে থাকার ফলে মুরগির অধিক ওজন নিশ্চিত হয়।
শুধু ব্যবসা করাই এই কোম্পানির মূল উদ্দেশ্য নয়। পাশাপাশি সামাজিক নানারকম কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। যেমন- করোনা মহামারির সময় স্থানীয়দেরকে চিকিৎসা ও সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং কিছু ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে বিনামূল্যে। এখানকার কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সাহায্য করা হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ নানারকম সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৪১৫ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে, যোগ করেন তিনি।
নিউ হোপ বাংলাদেশের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান সিউয়ান লি বলেন, সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত পন্য উৎপাদন করতে নানারকম গবেষণা করা হয় এখানে। আমাদের তৈরি খাবারের মধ্যে ক্ষতিকর কোন রাসায়নিক উপাদান নেই। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি এই খাবারে মুরগি ও মাছের স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। এখানে মাছের খাবারে বিশেষ কিছু উপাদান দেওয়ার ফলে এটি পানির উপর ভেসে থাকে। ফলে জলাশয়ে খাবারের অপচয় হয়না।
খাবারের গুনগত মান ঠিক রাখতে কারখানার ভেতর স্থাপন করা হয়েছে একটি কেমিক্যাল ল্যাব। এই ল্যাবে কর্মরত ফয়জার রহমান জানান, গুণগত মানসম্মন্ন কাঁচামাল দিয়ে খাবার তৈরি নিশ্চিত করতে নানারকম পরীক্ষা করা হয়। খাবার তৈরির পরও এর গুণমান অক্ষুণ্ন আছে কিনা এবং বাজারজাত উপযোগী কিনা তাও দেখা হয় সেখানে।
নিউ হোপের একজন ডিলার ও স্থানীয় লোহাগাছ এলাকার রাফিন পোল্ট্রি ফার্মের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান বলছিলেন, বর্তমানে আমার খামারে সবমিলে চল্লিশ হাজারের মতো মুরগি আছে। নিউ হোপের তৈরি খাবার এসব মুরগিকে খাওয়ানোর পাশাপাশি বাইরেও বিক্রি করি। মুরগি ও ডিম বিক্রির পাশাপাশি মুরগির বিষ্টা থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস স্থানীয়দের বাড়িতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ সবই নিউ হোপের অবদান। খামারীদের নানারকম প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে রোগ-বালাই প্রতিরোধ সবক্ষেত্রেই তারা সহায়তা দিচ্ছে।
মুরগির রোগ নির্ণয়ের জন্য কারখানার ভেতর রয়েছে একটি ল্যাব, দু’জন চিকিৎসক ও একজন ল্যাব সহকারী কাজ করেন এখানে। চিকিৎসকদের একজন রাবেয়া সুলতানা সোমা বলছিলেন, খামারীদের কাছ নমুনা সংগ্রহ করে মুরগির ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস জনিত বিভিন্ন রোগ নির্নয়ের পাশাপাশি তাদেরকে প্রতিকারের ব্যবস্থাও বাতলে দিয়ে থাকি। এখানে নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে আগাম তথ্য পেয়ে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পান খামারিরা।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকার ডিলার রাশেদ কবির জানান, মাছের জন্য তুলনামুলক কম দামে মানসম্মত খাবার তৈরি করছে নিউ হোপ। এর পাশাপাশি তাদের সার্ভিস টিম নিয়মিত মাঠে গিয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। যেকোনো ধরনের সহযোগিতা চাইলে তা পাওয়া যায়। আধুনিক উপায়ে মাছচাষসহ নানা বিষয়ে মানুষকে প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন তারা।