‘ব্যর্থ’ বিএনপিতে তবুও আশা

টানা দুই বছর সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকা বিএনপি কূটনীতির রাজনীতিতেও এগিয়ে গিয়েছিল, এমন বিশ্বাস ছিল দলটির। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু এই চাপ এড়িয়ে আওয়ামী লীগ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন করে ফেলায় এখন বিএনপির একাংশ মনে করছেন, তারা কূটনীতিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে অন্য অংশ বলছেন, পশ্চিমারা এখনো তাদের অবস্থান বদলায়নি। তাই নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করতে তারা রাজপথে আন্দোলনে অব্যাহত রাখবেন।

বিএনপির একাংশের নেতারা বলছেন, ২০০৯ সালের পর থেকে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিদেশিদের সঙ্গে বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারত, চীনের মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারেনি। তার ফলস্বরূপ আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ’১৮ সালের মতো আরেকটি ‘একতরফা’ নির্বাচন করে সরকার গঠন করে ফেলেছে। তবে দলটির আরেকটি অংশ মনে করছে, বিএনপি কূটনীতিতে সফল। নির্বাচনের পর ভারত ও চীন সরকারকে সমর্থন দিলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সরকারকে সমর্থন দেয়নি। এখন তারা জনগণকে সম্পৃক্ত করে নতুন কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামবেন।

তাদের দাবি, বিএনপির ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ নির্বাচন বর্জন করেছে। দুই-একটি দেশ ছাড়া সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো জনগণের পক্ষে আছে। আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে তারা সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারবেন।

গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৮টি অংশ নেয়। আওয়ামী লীগের নেতারা এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নতুন নজির তৈরি করেছেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬১ আসনে জয়লাভ করেছেন।

টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাপান, ভারত, চীন, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ অভিনন্দন জানিয়েছে। ঢাকায় তাদের রাষ্ট্রদূতরা গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোনে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক দেশ। ক্ষমতায় থাকাবস্থায় বিএনপি প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছিল। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে তারা ভারতকে আস্থায় নিতে পারেনি। যে কারণে প্রতিবেশী দেশটি বিএনপির সঙ্গে নেই। শুধু তাই নয়, বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্যরা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যার কারণে ভারত একতরফাভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে আস্থায় নিয়ে তাদের সঙ্গে কাজ করেছে। নির্বাচনের আগে ভারতের বিরুদ্ধে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা কথা বলেছেন। এ কারণে ভারত বিএনপির অবস্থান বুঝতে পেরেছে এবং আস্থায় নিতে পারেনি।

তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চীনের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বিএনপি ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে চীন দলটির নেতাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক বৈঠক করলেও বাস্তবতা বলছে, তারা বিএনপিকে আস্থায় নিতে পারেনি। প্রতিবেশী দেশগুলো বিএনপির পক্ষে না থাকলে অনেক দূরে থাকা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পক্ষে থাকলেও তারা কী করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রতিবেশী ভারত সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পেতে কাজ করতে পারে বলে বিশ্বাস বিএনপির এই নেতার।

বিএনপি সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবিতে আন্দোলন করছে। নির্বাচনের আগে সংলাপের সম্ভাবনা তৈরি হলেও নিরপেক্ষ সরকার মেনে নেওয়ার শর্ত দেয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করার অবস্থানে অনড় থাকে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এই সংকটের সময় চীন ও ভারত তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে, যা আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়। তখন বিএনপি চীন ও ভারতের এমন অবস্থানে অসন্তোষ ও সমালোচনা করে। চীনের অবস্থান জনগণের ইচ্ছা বা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন নয় বলে মন্তব্য করে বিএনপি। অন্যদিকে ভারতের সমালোচনা করে বিএনপি বলেছে, দেশটি বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে কিংবা অভিনন্দন জানিয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা তা নিয়ে ভাবতে হবে। এসব দেশ সন্তুষ্ট থাকলে হবে না। এসব দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটুকু? আমাদের রপ্তানি পণ্যের বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো। এসব দেশ সমর্থন না দিলে কিংবা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি বললে সে কথার গুরুত্ব রয়েছে। তারা বাণিজ্য বিষয়ে কোনো একটা পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশ দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

জাপান, ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশ সরকারকে অভিনন্দন জানালেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে শুরু থেকেই তাগিদ দিয়ে আসছিল। কিন্তু শেষমেশ বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলোকে বাদ দিয়েই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচন করায় তারা প্রশ্ন তুলেছে। বিবৃতি দিয়ে তারা এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির কূটনীতি ব্যর্থ হয়েছে পুরোপুরি বলা যাবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানায়নি। শুধু তাই নয়, তারা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে বিবৃতি দিয়েছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। এটাই আমাদের অর্জন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছি সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। নির্বাচনের পর আমরা নতুন কর্মসূচি প্রণয়নে রাজপথে আমাদের আন্দোলন সংগ্রামে শরিক ৬৩টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছি। নির্বাচন-পরবর্তী করণীয় ও আন্দোলন কর্মসূচির ধরন নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করব।’