'আব্বার খুব ইচ্ছে ছিল আমি মেডিক্যালে পড়াশোনা করি। একাদশে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আব্বার অনুপ্রেরণায় আমিও মেডিক্যালে ভর্তির লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। তেজগাঁও কলেজে থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পাই। এরপর থেকে আমার দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিল। একদিন বড় ডাক্তার হব দিনে দিনে এই স্বপ্ন আরও বাড়ছিল। কিন্ত সময় যত বাড়ছিল আমার নিজের ওপর চাপ হয়ে যাচ্ছিল। ২০০১ সালে এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে খুব প্রেশারে পড়ে যাই। দিনরাত পড়াশোনা করতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। তখন থেকেই আমার সমস্যার শুরু। চিকিৎসকরা জানান আমি সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত- বলছিলেন সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক আবদুল করিম জামাল।
জামালের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার কামিনীগঞ্জে। জামালের স্কুলশিক্ষক বাবা আব্দুল মতিন ছেলেকে চিকিৎসক হিসেবে দেখে যেতে পারেননি। জামাল যখন সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ছিলেন তখন তার বাবা মারা যান। তার মা জাহানারা বেগমও ছেলেকে ডাক্তার বানাতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।
২০০১ সালে আবদুল করিম জামাল এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হলে তার জীবনে হতাশা নেমে আসে। চিকিৎসায় তার সিজোফ্রেনিয়া রোগ ধরা পড়ে। কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি ২০০৩ সাল পর্যন্ত আরও ৪ বার এমবিবিএস পরীক্ষা দিলেও তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। যা তাকে আরও হতাশা শুরু করে। এদিকে তার অসুখও বাড়তে থাকে। তিনি আবোলতাবোল বকতে থাকেন। এক পর্যায়ে তার বাবা আব্দুল মতিন তাকে বাড়িতে নিয়ে যান এবং চিকিৎসক দেখাতে থাকেন।
জামালের সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত হওয়া এবং সুস্থ হয়ে আবার মেডিক্যালে এমবিবিএস পরীক্ষা দিতে বসার মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ ২০ বছর। এই ২০ বছর পর পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ পাওয়াও কিন্ত দেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রম ঘটনা। এমনকি তার এই ফিরে আসার গল্প আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন গুরুত্ব দিয়ে তাদের ওয়েব পেজে তুলে ধরেছে।
মানসিক রোগের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া সবচেয়ে জটিল এবং এটার চিকিৎসাও জটিল। এই রোগ পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রতি এক শ জনের মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত হয়। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বাস্তব চিন্তা একদম কমে যায়, বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশন হয়, গায়েবি আওয়াজ শুনতে পায়, যা ঘটেনি বা যা নেই এমন জিনিসে বিশ্বাস করে। এটি মূলত সাইকোটিক ডিজঅর্ডার।
দেশ রূপান্তরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপনে জামাল তার জীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের গল্প তুলে ধরেন। জামাল বলেন, চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে আমার মনে ভয় ধরে যায়। আমি দিনরাত পড়তে থাকি। এতে আমার মাথায় সমস্যা চলে আসে। চূড়ান্ত পরীক্ষার আগেই আমার মধ্যে পরিবর্তন আসে, আমি চাপ নিতে পারছিলাম না। ২০০১-৩ এই সময়ে আমার চিকিৎসা চলতে থাকে। চিকিৎসার পাশাপাশি আমার পড়াশোনাও চলছিল। ২০০৩ সালে যখন ৪র্থ বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হই তখন মেডিক্যাল থেকে আমাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসায় আমি সুস্থ হয়ে উঠি।
তবে সুস্থ হয়ে উঠলেও অনুপস্থিত থাকার কারণে সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ জামালের ভর্তি বাতিল করে দেয়। ২০২২ সালের শুরু থেকেই জামাল আবারও পড়াশোনা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং তার শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করে সুস্থ হওয়ার কথা জানান এবং পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার আগ্রহের কথা জানান। কিন্ত তাতে তাকে কেউই আশার বাণী শোনাতে রাজি হননি। কিন্ত অদম্য জামাল হাল ছেড়ে দেননি। শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দপ্তরে ছোটাছুটি করতে থাকেন। নানা দেন দরবার শেষে ২০২২ সালের নভেম্বরে তিনি এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে দুই লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয় তাকে। তার ফলাফল প্রকাশ হয় ২০২৩ সালের ৪ মার্চ। এমবিবিএসের পর তিনি সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল থেকে একই বছরের ২০ মার্চ ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন যা শেষ হবে চলতি বছরের ২০ মার্চ জামাল।
এদিকে ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার আগেই জামালের মাথায় এখন নতুন দুশ্চিন্তা। তার বয়স ৪৭ বছর হয়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আপাতত তার ভাবনায় ইন্টার্ন শেষ করার পর যদি একটা ভালো হাসপাতালে চাকরি পাওয়া যায়।
২০ বছর পর জামালের পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ছিল না বলে জানান সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নূরুল হুদা লেনিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামাল যখন তার আগ্রহের কথা আমাকে জানায়। শুরুতে আমি নিজেও তাকে না বলে দিয়েছি। কিন্ত তার ইচ্ছে ও আগ্রহ আমাকে ভাবতে বাধ্য করে। এরপর আমরা একাধিক মিটিং করি এবং এক পর্যায়ে শিক্ষকদের একটি বোর্ড বসিয়ে বিশেষ বিবেচনায় তাকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেই।
তিনি বলেন, জামালকে যেদিন পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার কথা জানাই, তার চোখে মুখে বিশ্ব জয়ের আনন্দ দেখতে পাই। আমার মনে হয়েছে এই এক মুহূর্তে সে গত ২০ বছরের কষ্ট ভুলে গেছে। সেদিন আমি জামালকে একটা অনুরোধ করেছিলাম, আজ আমি তোমার উপকার করলাম, আগামীতে ডাক্তার হয়ে তুমি যেন আরও ১০টা পরিবারের উপকার করতে পার।
ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে জামাল কেমন করছেন এমন এক প্রশ্নে ডা. নূরুল হুদা বলেন, আমি নিয়মিত তার খোঁজ-খবর রাখছি। তার শিক্ষক এবং সহপাঠীরা জানিয়েছেন, অন্য ইন্টার্নদের তুলনায় জামাল দ্রুত বুঝতে পারছে, তার মধ্যে আগের কোনো সমস্যা নেই। যেহেতু জামালের সরকারি চাকরি নেই, তাই ইন্টার্ন শেষ হলে জামালকে আমার পরিচিত ভালো একটা বেসরকারি হাসপাতালে চাকরির ব্যবস্থা করে দেব।
আবদুল করিম জামাল বলেন, এখন মেডিক্যালের ছাত্রাবাসে থাকছি। ইন্টার্ন শেষ করে একটা চাকরি খুঁজে নেওয়া দরকার। এরপর স্ত্রী মাহমুদা আক্তার ও দুই মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে আসব, মেয়েদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাব। গত ২০ বছর অসুস্থ থাকায় কোনো সঞ্চয় নেই, চাকরি পেলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে। এরপর ধীরে ধীরে দেশের বাইরে থেকে চিকিৎসা বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরে এসে মানুষের সেবা করতে চাই।