টাকা ছাড়া করেন না পরিদর্শন-তদন্ত-অনুমোদন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রোভিসি) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাদ্রাসা পরিদর্শন, অধিভুক্তি, প্রাথমিক পাঠদান, নবায়ন, তদন্ত, নিয়োগ প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণসহ নানা ক্ষেত্রে তার অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। মাত্র ৩২০ দিনে ৪০০ এর বেশি মাদ্রাসা পরিদর্শন করে তিনি রেকর্ড গড়েছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার, রোহিঙ্গাদের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণও মিলেছে।

সম্প্রতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও এর প্রমাণক হিসেবে মোট ৯৭ পৃষ্ঠার সংযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) জমা পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে এই অভিযোগ দিয়েছেন মো. আশ্রাফ উদ্দিন তামিম।

জানতে চাইলে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. হাসিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। যে কোনো অভিযোগ পেলেই আমরা তা দ্রুততার সঙ্গে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করি।’ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রোভিসি আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘অভিযোগের বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। আসলে এর কোনো সত্যতা নেই। এটা দুরভিসন্ধি ও চক্রান্তমূলক। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কারও কারও দুর্নীতি ঢাকার জন্য এই অভিযোগ বাহন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু কিছু অপরাধী বাঁচার স্বার্থে এ কাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কয়টা মাদ্রাসায় গিয়েছি, সে হিসাব আমার কাছে নেই। তবে যথাযথ অনুমতি ছাড়া কোথায়ও যাওয়ার সুযোগ নেই। সবই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানে। আমি নিয়মিতই অফিসে আসছি। কিন্তু বর্তমানে আমার কোনো কাজও নেই, দায়িত্বও নেই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবুল কালাম আজাদ ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই বছর আগে যোগদান করেছেন। তার যোগদানের মোট ৭২০ দিনের মধ্যে ৪০০ দিন অফিস করেছেন। বাকি ৩২০ দিনে তিনি প্রায় চার ৪০০ এর বেশি মাদ্রাসায় পরিদর্শন, অধিভুক্তি, প্রাথমিক পাঠদান, নবায়ন, তদন্ত, নিয়োগ প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণসহ নানা কাজে গিয়েছেন। বেশিরভাগ শুক্র-শনিবারও তিনি বাদ দেননি। অফিসে আসা-যাওয়ায়ও তিনি কোনো নিয়মনীতি মানেন না। অনেক সময়ই বিকেলে বা সন্ধ্যায় এসে তার দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাত পর্যন্ত বসিয়ে রাখেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রো-ভিসি মাদ্রাসা অধিভুক্তি ও নবায়নে পরিদর্শনে গেলে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে ৫০ হাজার টাকা করে নেন। আর প্রাথমিক পাঠদানের অনুমোদনের জন্য গেলে তাকে দিতে হয় এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগে প্রতিনিধি হিসেবে গেলে তাকে এক লাখ টাকার কম দিলে নেন না। এছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও টিএ/ডিএ (ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা) নেন। তিনি গত বছরের জুন মাসেই শুধু টিএ/ডিএ খাতে ২ লাখ ৫০ হাজার ১৬৮ টাকা নিয়েছেন।

গাড়ির জ্বালানি তেল ব্যবহারে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে রয়েছে বড় অভিযোগ। তিনি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ২০০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু তিনি অনেক মাসেই ৩৫০ থেকে ৪০০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল নেন। তার বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার হলেও তিনি তা দেখান ১৫০ কিলোমিটার। এ ব্যাপারে তার গাড়িচালককে শোকজও করা হয়েছে। এছাড়া তার জন্য বরাদ্দকৃত ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৫৩১৬ গাড়ি থাকার পরও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাসও প্রায় সময়ই ব্যবহার করেন।

সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যের মেয়াদ গত বছরের ৪ জানুয়ারি শেষ হওয়ার পর প্রো-ভিসি তার নিজের স্বাক্ষরে চিঠি ইস্যু করে নিজেই উপাচার্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং উপাচার্যের অফিস কক্ষ ব্যবহার শুরু করেন। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে যাদের নাম উপাচার্য হিসেবে প্রস্তাব করা হয় তাদের নামেই তিনি বিভিন্ন মহলে অভিযোগ জমা দেন। আগে তিনি প্রো-ভিসির পাশাপাশি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। সে সময়ও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম প্রমাণিত হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ড. আবুল কালাম আজাদ বিভিন্ন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগে প্রতিনিধি হিসেবে নিজেই নিজের নামে চিঠি ইস্যু করেন। বরিশালের বাঘিয়া আল আমিন কামিল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ পদে নিয়োগে বড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সেখান থেকে তিনি বড় অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের খোশবাজার ছালেহিয়া দারুচ্চুন্নাত কামিল মাদ্রাসার নিয়োগ প্রতিনিধি হিসেবে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি ঢাকায় কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজশে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তিনি ওই মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ নিয়োগ দেন। পটুয়াখালীর ‘দুমকী ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসা’র গভর্নিং বডি অনুমোদন নিয়ে মামলা থাকার পরও তিনি তা অনুমোদন দেন। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পাইকান আকবরিয়া ফাযিল মাদ্রাসা, ঝালকাঠি এন. এস. কামিল মাদ্রাসা পরিদর্শনে নিজেই নিজের চিঠি অনুমোদন করেন। এমনকি নিজেই আবার নিজের টিএ/ডিএ বিল অনুমোদন করেন।

ইউজিসিতে জমা দেওয়া অভিযোগেও তার ব্যাংক হিসেবে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ দেওয়া হয়েছে। তিনি যোগদানের পর থেকে এক বছর ১০ মাসে তার ব্যাংক হিসাবে ৭৯ লাখ ১০ হাজার ৮৪৭ টাকা জমা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ তিনি এই সময়ে বেতন-ভাতা পেয়েছেন ২৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৭০ টাকা। এছাড়া তার আরও তিনটি ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখলেও বড় ধরনের লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রো-ভিসির শেয়ার বাজারে বড় বিনিয়োগ এবং তার ও স্ত্রীর নামে লাখ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বলেন, ‘আবুল কালাম আজাদ নিয়োগ বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে যাওয়ার আগেই মাদ্রাসার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসেন। একই কাজ করেন পাঠদান, অধিভুক্তি, গভর্নিং বডির অনুমোদনসহ নানা কাজে। তার মনঃপূত সবকিছু না হলে তিনি ওই মাদ্রাসায় যেতে চান না। আবার অনেক সময় দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রাখেন। তার এসব কাজে সহযোগিতা করেন পিএস (একান্ত সচিব) ইয়াছিন আলী ও গাড়িচালক আলমগীর।’

অভিযোগে বলা হয়েছে, আবুল কালাম আজাদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একটি বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তহবিল তছরুপ, রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উত্তোলনকৃত টাকা আত্মসাৎ, লুঙ্গি পরে অফিসে আসা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগে তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। এমনকি তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি হওয়া সত্ত্বেও ‘ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম’ নামে একটি সংস্থা নিয়মিতভাবে পরিচালনা করছেন। আর এ কাজেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িসহ বিভিন্ন কিছু ব্যবহার করছেন।

ইউজিসিতে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ ছাত্রজীবনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়াতে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক পদ ‘সাথী’ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাবাসহ পুরো পরিবারই স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। এমনকি তার বাবা জয়নুল আবেদীন হাওলাদার ঝালকাঠিতে রাজাকার হিসেবে পরিচিত। জোট সরকারের আমলে আবুল কালাম আজাদের চাকরি হয়। আর তার চাকরির সুপারিশদাতা ছিলেন যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী।

প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, ‘আমরা এখনো কোনো অভিযোগের কপি হাতে পাইনি। তবে কিছুটা শুনেছি।’ 

তিনি বলেন, ‘যদি কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তার যথাযথ তদন্ত হতে হবে। সেখানে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখানে আসলে আমার বলা বা করার কিছু নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।’