নান্দনিক চলচ্চিত্র, মননশীল দর্শক, আলোকিত সমাজ স্লোগানে শনিবার পর্দা উঠছে ‘২২তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৪’-এর। ৯ দিনব্যাপী এ উৎসবে প্রদর্শিত হবে ৭৫টি দেশের প্রায় আড়াইশটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ১২৯টি, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও স্বাধীন চলচ্চিত্র ১২৩টি; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র রয়েছে ৭১টি। উৎসব চলবে আগামী ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।
উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সভাপতিত্বে এদিন বিকেল ৪টায় শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের মূল মিলনায়তনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে হাজির হন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত অভিনেত্রী শ্রীমতী শর্মিলা ঠাকুর বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানের আসন অলংকৃত করেন।
শর্মিলা ঠাকুরকে ঢাকায় পেয়ে যেন পূর্ণতা পেল এই উৎসব। রবীন্দ্রনাথের বংশধর, পতৌদি নবাব পরিবারের বধূ এদিন দেখা দিলেন চিরচেনা ক্লাসি রূপে। কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীকে দেখা গেছে অফ হোয়াইট শাড়িতে। শীতকে মানিয়ে নিতে সঙ্গে গায়ে জড়িয়েছিলেন একখানি পাতলা পশমিনা চাদর।
দ্বাবিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন করতে এসে শর্মিলা কথা বললেন ইংরেজিতেই। তার যুক্তি, এটা আন্তর্জাতিক উৎসব আর ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। তাই সবার বোঝার সুবিধার্থে ইংরেজিকেই বেছে নিয়েছেন। তবে উৎসব আয়োজক আহমেদ মুজতবা জামালের অনুরোধে বাংলাও বললেন খানিক।
শর্মিলার ভাষ্যে, ‘আমি বাঙালি, আমি যে বাংলা বলতে পারি তা সবাই জানে। তাই আজ আর বাংলা বলব না।’
‘অপুর সংসার’ খ্যাত এ অভিনেত্রী বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। এত সুন্দর আয়োজনে ফাইনালি আসতে পেরেছি। আমার আসলে আরও একদিন আগে আসার কথা ছিল। কিন্তু মুম্বাইতে অসম্ভব ঠাণ্ডা পড়ায় ফ্লাইট ক্যানসেল হয়ে যায়। ভেবেছিলাম এ যাত্রায় আর আসা হবে না। কিন্তু আয়োজকরা ঠিকই ব্যবস্থা করেন। আমাকে দুটি সিটওয়ালা বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের স্পেশাল বিমানে আনা হয়েছে। এটা এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার ছিল। এসে ভীষণ ভালো লাগছে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের নাচের পারফর্ম দেখে শর্মিলা বলেন, ‘আমার কাছে নাচটা খুব ভালো লাগল। নাচের মাধ্যমে একেবারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরু থেকে শেষ অবধি একটা জার্নি দেখানো হয়েছে। তাতে জানতে পারলাম, এদেশে ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু। আর আমার চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু ‘অপুর সংসার’ দিয়ে। সেটিও প্রায় একই সময়ে। তার মানে আমার আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজীবন একই বয়সী। বাংলাদেশের পুরনো দিনের সিনেমার গানগুলো শুনে খুব ভালো লাগল। কী মিষ্টি কিছু গান!’
সবশেষে শর্মিলা জানান, তিনি এই আয়োজন শুধুই উদ্বোধন করতে আসেননি। এশিয়া চলচ্চিত্র বিভাগের বিচার কাজ করে তবেই ঘরে ফিরবেন। অর্থাৎ এই কাজ করার জন্য তাকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ঢাকাতেই থাকতে হবে।
উদ্বোধনী দিনে প্রদর্শিত হয় দুটি সিনেমা। ইরানি পরিচালক মুর্তজা অতাশ জমজম নির্মিত ও জয়া আহসান অভিনীত ‘ফেরেশতে’ এবং বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজিত ও শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত সিনেমা ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’।
চলতি বছরের এই উৎসবে ১০টি বিভাগে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এশিয়ান প্রতিযোগিতা বিভাগ, রেট্রোস্পেকটিভ বিভাগ, ট্রিবিউট, বাংলাদেশ প্যানারোমা, ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড, চিল্ড্রেনস ফিল্ম, স্পিরিচুয়াল ফিল্মস, শর্ট অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম এবং উইমেন্স ফিল্ম বিভাগ। উৎসবের ভেন্যু হিসেবে আছে অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর অডিটরিয়াম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাডেমি মিলনায়তনে। এসব মিলনায়তনের সব প্রদর্শনী সবাই বিনামূল্যে উপভোগ করতে পারবেন। আসন সংখ্যা সীমিত থাকায় ‘আগে এলে আগে দেখবেন’ ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হবে। তবে উদ্বোধনী ও সমাপ্তি অনুষ্ঠানটি উপভোগ করবেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল জানান, এবারের চলচ্চিত্র উৎসবে আরও উপস্থিত থাকবেন ইরানের খ্যাতিমান নির্মাতা মাজিদ মাজিদি, স্বস্তিকা মুখার্জী, অঞ্জন দত্তসহ বিভিন্ন দেশের নামিদামি সব তারকা।
২২তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সবার আকর্ষণ এবার ‘মাস্টার ক্লাস’-এ! কারণ মাস্টার ক্লাস নিতে যাচ্ছেন ইরানি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ‘চিলড্রেন অব হেভেন’, ‘বারান’ এবং ‘সং অব স্প্যারো’র মতো বিশ্বনন্দিত সিনেমার পরিচালক মাজিদ মাজিদি। এ ছাড়া মাস্টার ক্লাসের দুটি ভিন্ন সেশনে কথা বলবেন চীনের সাংহাই ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশনের ডেপুটি চেয়ার শি চুয়ান এবং ভারতের নির্মাতা, অভিনেতা ও গায়ক অঞ্জন দত্ত। মাস্টার ক্লাসটি অনুষ্ঠিত হবে ২৭ জানুয়ারি দিনভর।
মাস্টার ক্লাসের সেশনগুলো পরিচালনা করবেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু। মাস্টার ক্লাস শেষে পরিবেশিত হবে অঞ্জন দত্তের সংগীত। এই চারটি সেশনের জন্যই অগ্রিম নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন লিংক উৎসবের ফেসবুক পেইজে পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন মুজতবা জামাল।
এ উৎসবে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস ও সামিট গ্রুপ।
প্রসঙ্গত, ১৯৯২ সাল থেকে নিয়মিত এই চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে আসছে রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি। এই সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে।