নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে টানা আন্দোলনে ছিল বিএনপি। সমানতালে চলছিল দলটির কূটনৈতিক রাজনীতিও। কিন্তু ২৮ অক্টোবরের পর কঠোর আন্দোলনে নেমে মামলায় জড়িয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান দলের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন করে ফেলার পর সরকার গঠন করে অভিনন্দন ও স্বীকৃতি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। তবে দলটির নেতারা বলছেন, সরকারকে কে স্বীকৃতি দিল না দিল সেটা নিয়ে তারা ভাবছেন না। তারা নতুন করে আন্দোলনের কথাই ভাবছেন।
এই চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে আগামী শুক্র ও শনিবার দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি গত ১৫ বছর ধরে আন্দোলন করছে। নেতাকর্মীরা জীবন দিয়েছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেক নেতাকর্মী এখনো জেলে রয়েছেন। এখন আমরা কারাবন্দি নেতাদের মুক্তির চেষ্টা করছি। পাশাপাশি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে। সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এভাবে ধাপে ধাপে আন্দোলন চলতে থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপির সবচেয়ে শক্তির জায়গা দেশের জনগণ। তারা সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের জনগণ কষ্টে আছে। গ্যাসের সংকটে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। দেশের ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। সরকার ছাড়া দেশ ও দেশের মানুষ ভালো নেই।’
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে বিএনপি দুই বছরের বেশি সময় ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছিল। এসব আন্দোলনে হামলা, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের নির্বাচনে তাদের প্রত্যাশা নিয়ে তৎপর হয়ে ওঠে। এই অংশ হিসেবে তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিএনপির সঙ্গে বিভিন্ন সময় বৈঠক করে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলও ঢাকা সফর করে। নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সমালোচনা করে রাশিয়া ও চীন। যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি ও শ্রমনীতি ঘোষণা করে সরকারের ওপর বেশ চাপ প্রয়োগ করে। বিদেশিদের এমন তৎপরতার পাশাপাশি বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দলটির কূটনৈতিক রাজনীতি অনেকটাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বিভিন্ন সময় মার্কিন কংগ্রেসম্যান থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিবৃতি ও চিঠি চালাচালিতে। এমনকি তফসিল ঘোষণার দুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে সংলাপের আহ্বান জানায়।
তবে শেষ পর্যন্ত সরকার ২৭টি দলকে নির্বাচন আনতে সক্ষম হয়। বিএনপি ও তার মিত্ররা ভোট বর্জনে ডাক দিয়ে অসহযোগ ও প্রচার কর্মসূচি চালায়। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
টানা চারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব,কমনওয়েলথ মহাসচিব ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হচ্ছে ভারত, রাশিয়া, চীন ও জাপান। এর মধ্যে অপ্রত্যাশিত ছিল জাপানের অভিনন্দন। কারণ দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বলয়ভুক্ত। তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা নির্বাচনোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলেও দাবি করে তারা। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূত যথাক্রমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এসব ঘটনায় স্বীকৃতির সংকটে থাকা আওয়ামী লীগ সরকার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি তারা আন্দোলন ও কূটনীতির ক্ষেত্রে দল ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন। যে কারণে তারা দলের দায়িত্বশীল নেতাদের প্রতি ক্ষুব্ধ।
এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে রয়েছে। সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের এক দফার আন্দোলন চলতে থাকবে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের কেউ কেউ কিছুটা হতাশ হলেও সারা দেশের নেতাকর্মীদের মনোবল অটুট রয়েছে। তারাই এ আন্দোলন সফল করবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়ে আমরা জনগণের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেছি। জনগণ ভোট বর্জন করেছে। আমরা বিদেশের কারও ভরসায় নয়, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাব। সরকারের পদত্যাগ ঘটিয়ে ঘরে ফিরব।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির এক সদস্য বলেন, দেশ এখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে। ডলার সংকটের কারণে আমদানি করতে পারছে না সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর স্বীকার করেছেন দেশের অর্থনৈতিক সংকটের কথা। সরকার এখন যাদের স্বীকৃতি পেয়ে খুশি, তারা কেউ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবে না। এ বিষয়ে সরকারকে সহায়তা করতে পারবে না। ভারত, চীনের কাছ থেকে আমরা আমদানি করি বেশি।’
বিএনপির দপ্তরসংশ্লিষ্ট এক নেতা বলেন, গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মহাসমাবেশের পর আড়াই মাস কার্যালয় বন্ধ ছিল। এখন কার্যালয় খোলা হয়েছে। নেতাকর্মীরা আসছেন। পাশাপাশি গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে নেতারা বসছেন। দলের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এর বাইরে নেতাকর্মীদের জামিনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহাসমাবেশ ও পরবর্তী সময় হরতাল-অবরোধ ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় বিএনপি কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা এখনো কারাগারে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর চারটি মামলায় জামিন বাকি ছিল। এর মধ্যে গতকাল দুটি মামলায় জামিন হয়েছে। বাকি দুটি মামলার জামিন শুনানি ২৪ জানুয়ারি হবে।’
বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, ‘দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে মামলায় জড়িয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অসংখ্য নেতাকর্মী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের জামিনের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি যারা কারাগারে রয়েছে তাদের জামিন আবেদন করা হচ্ছে। আশা করছি নেতাকর্মীরা জামিনে মুক্ত হতে পারবেন।’
কালো পতাকা কর্মসূচি : গতকাল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার সারা দেশের সব জেলা শহরে এবং ২৭ জানুয়ারি শনিবার সব মহানগরে কালো পতাকা মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
কর্মসূচি ঘোষণা করে রিজভী বলেন, দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ কারাবন্দি সব নেতাকর্মীর মুক্তি, তাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহার ও অবৈধ সংসদ বাতিলসহ এক দফা দাবি আদায়ে এ কর্মসূচি।
বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দল ও জোট আলাদাভাবে একই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।