বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো হৃদরোগ চিকিৎসায় সর্বাধুনিক ‘রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি’ প্রযুক্তির ব্যবহার করেছেন রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা। তারা রোবট দিয়ে সফলভাবে দু’জন হৃদরোগীর হার্টে রিং পড়িয়েছেন। এর মাধ্যমে চিকিৎসায় রোবটিক প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ। বর্তমানে রোগীরা ভালো আছেন।
রবিবার (২১ জানুয়ারি) এই দুই হৃদরোগীর প্রধান ধমনীতে বিনামূল্যে রোবটের মাধ্যমে রিং পরানো হয়। রোবটিক সার্জারির এই অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার ও তার বিশেষায়িত টিম। এই চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্বোধন করেন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল হাসান মিলন ও কার্ডিলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. সালাউদ্দিন।
রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি নিয়ে মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকারের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। এই চিকিৎসক এই ধরণের সার্জারির বিস্তারিত জানান।
ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা রোবটটা এক মাসের জন্য এনেছি। আমাদের অবকাঠামোতে খাপ খায় কি না সেটা দেখার জন্য। ওই রোবট কোম্পানি রোবটের সাথে ১০টি ডিভাইস দিয়েছে। এসব ডিভাইস দিয়ে ১০ রোগীকে আমরা বিনামূল্যে রোবটের মাধ্যমে রিং পড়াতে পারবো। এটা সফল হলে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারকে অনুরোধ জানাবে রোবট কিনে দেওয়ার জন্য।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, এখন ওয়ারলেসের মাধ্যমে সার্জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ রোগী ছিল ভেতরে, আমরা ছিলাম বাইরে কন্ট্রোল রুমে। এরপর আমরা ওয়ালেস ছাড়াই করবো। আমাদের লক্ষ্য হলো হাসপাতালের বাইরে থেকে কন্ট্রোল ইউনিট নিয়ে এনজিওপ্লাস্টি করা। এক্ষেত্রে আমরা হাসপাতালে থেকে রোবট দিয়ে দেশের যে কোনো প্রান্তে রিং পড়াতে পারবো।
কীভাবে কাজ করে রোবট
ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার জানান, রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি বর্তমান পৃথিবীতে হার্টের রিং পরানোর সর্বাধুনিক এবং সর্বশেষ প্রযুক্তি। কার্ডিওলজিস্টরা এখনো ক্যাথল্যাবে নিজেরা রোগীর কাছ থেকে রোগীদের হার্টের রিং পরান। কিন্তু রোবটের মাধ্যমে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা রোগীর চেয়ে দূরে থেকে নিখুঁতভাবে হৃদরোগীদের হার্টের ধমনীতে রিং পরান। এই রোবটের দুটি অংশ থাকে একটি হলো রোবটের একটি হাত যা ক্যাথল্যাবে থাকে। আরেকটি থাকে কন্ট্রোল সেকশন, যেখান থেকে মূল কার্ডিওলজিস্ট পুরো রিং পরানো কার্যক্রমটি দূর থেকে সম্পন্ন করে থাকেন।
কী সুবিধা এই সার্জারিতে
ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার জানান, রোবটিক এনজিওপ্লাস্টির প্রথম সুবিধা হল হার্টের রিং পরানোর জটিল প্রক্রিয়াটি রোবটের মাধ্যমে খুব সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে করা যায়। রোগীদের জন্য আরেকটি সুবিধা হল হৃদরোগ চিকিৎসকগণ সরাসরি এনজিওপ্লাস্টি করতে গেলে যে সময় লাগে রোবটের মাধ্যমে সেটি করতে অনেক কম সময় লাগে ও জটিলতাও কম হয় ।
এই চিকিৎসক আরও বলেন, যেসব চিকিৎসক অনেক এনজিওপ্লাস্টি করেন, এক সময় তারা দুটি সমস্যায় পড়েন। প্রথমত হল রেডিয়েশনের কারণে অনেক চিকিৎসক ব্রেন ক্যান্সার ও চোখে ক্যাটারাক্টসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার ঝুঁকিতে পড়েন। এছাড়া হৃদরোগ চিকিৎসকরা যখন অপারেশন থিয়েটার বা ক্যাথলেবে কাজ করেন রেডিয়েশন প্রটেকশন এর জন্য তারা ১২ থেকে ১৫ পাউন্ড ওজনের একটি বিশেষ জামা দীর্ঘক্ষণ যাবত পরতে হয়। ফলে ঘাড়ের নার্ভের চাপ পড়ে এবং পরবর্তীতে চিকিৎসক খুব বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘাড় ও হাতে ব্যথার কারণে এনজিওপ্লাস্টি করতে পারেন না। রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে রেডিয়েশন ছাড়াই এবং ভারী বিশেষ জামা পড়া ছাড়াই ক্যাথল্যাবের কন্ট্রোলরুমে, তার অফিসে, সুযোগ-সুবিধা থাকলে বাসায় বসে অথবা দেশের বাইরে থেকেও ইন্টারনেটের মাধ্যমে হার্টের রিং পরাতে পারবেন।
দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হল অত্যাধুনিক এই চিকিৎসা প্রযুক্তি চালু হলে রোগীকে আর দেশের বাইরে যেতে হবে না বলেও জানান ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার।
এখন দরকার দক্ষ জনবল
জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের চিকিৎসরা জানান, ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার ভারতের হায়দ্রাবাদের অ্যাপোলো হসপিটাল এবং চীনের সাংহাই থেকে রোবোটিক এনজিওপ্লাস্ট এর উপরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাছাড়া তিনি রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টিতে ভারতের প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. পিসি রাথ এর কাছ থেকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ।
মেশিনের দাম ৫ কোটি টাকা
যে রোবট দিয়ে এনজিওপ্লাস্টি করা হয়েছে, সেটি ফ্রান্সের তৈরি ও দাম ৫ কোটি টাকা বলে জানান ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার। তিনি বলেন, রোবটি একমাস ব্যবহারের জন্য ফ্রান্স থেকে নিয়ে আনা হয়েছে। যদি রোবটিক সিস্টেমটি বাংলাদেশের অবকাঠামোর সাথে সহায়ক হয় তাহলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এই রোবটিক সিস্টেমটি কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করবে এবং খুব কম খরচে আন্তর্জাতিক সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তি সব সময়ের জন্য জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চালু রাখতে পারবে। এভাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ডিজিটালাইজ পদ্ধতির ব্যবহার করার সুযোগ পাবে ।
বাংলাদেশে এটাই প্রথম
চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশের এখনো সরকারি ও বেসরকারি কোন হাসপাতালে রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টি শুরু হয়নি। ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার দেশের প্রথম চিকিৎসক যিনি এই রোবটিক এনজিওপ্লাস্টির এর উপর ট্রেনিং নিয়েছেন। যদি সরকার এই রোবটিক সিস্টেমটি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে সরবরাহ করে, তাহলে ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার ও তার দক্ষ টিম পরিপূর্ণভাবে সবসময়ের জন্য সর্বাধুনিক এই চিকিৎসা পদ্ধতি বাংলাদেশের জনগণকে স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারবে।
চিকিৎসকরা জানান, ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার এর আগেও বাংলাদেশের প্রথম বারের মত কোনো সরকারি হাসপাতালে ট্রান্স ক্যাথেটার এউটিক ভাল্ব রিপ্লেসমেন্ট বা টিএভিআর পদ্ধতিতে বুক না কেটে হার্টের ভাল্ব প্রতিস্থাপন করেন। ২০২০ সালে তার নেতৃত্বে প্রথম জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে সফলভাবে এই অপারেশন সম্পন্ন হয়। এখনো তিনি টিএভিআর পদ্ধতিতে এউটিক ভাল্ব প্রতিস্থাপন করছেন। সম্প্রতি সরকারি হাসপাতালে প্রথমবারের মতো হার্ট অ্যাটাক ঘটিয়ে এইচ ও সি এম বা হাইপারট্রপিক অবস্ট্রাক্টিভ কার্ডিওমায়োপ্যাথি চিকিৎসা করেন।
বিশ্বে আগেই শুরু
চিকিৎসকরা আরও জানান, রোবটের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু আগেই শুরু হয়েছে। স্পাইনাল সার্জারিতে এটা ইতিমধ্যে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত। রোবটিক করোনারি আটারি বাইপাস গ্রাফ্ট বা সিএবিজি ভারত ও সিঙ্গাপুরে হচ্ছে। ভারতে ১৯১৮ সালে অধ্যাপক ডা. তেজেশ প্যাটেল এটা প্রথম শুরু করেন। তিনি যখন প্রথম রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি করেন তখন তিনি তার থেকে প্রায় বত্রিশ কিলোমিটার দূরে এক রোগীর হার্টের রিং পরান । তখন থেকে এটি সারা বিশ্বে শুরু হয় এবং এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলছে, প্রতিনিয়ত গবেষণা এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি এর সাথে সংযুক্ত হচ্ছে।