শৈত্যপ্রবাহ ৪৩ জেলায়

দেশের ৪৩টি জেলায় বইছে মৃদু ও মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ। এরই মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গায় মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন দেশের ৪৪টি আবহাওয়া স্টেশনের মধ্যে ২৬টিতেই তাপমাত্রার পারদ ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর নিচে নেমে আসে। এর মধ্যে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, তেঁতুলিয়া ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে মাঝারি (যে এলাকায় তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে) মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বইছে। বাকি আবহাওয়া স্টেশনগুলোতে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ (যে এলাকায় তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০-এর মধ্যে থাকে) বইছে।

দেশজুড়ে চলমান শৈত্যপ্রবাহ শিগগিরই থামবে না উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ মঙ্গলবার ও কাল বুধবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে। আর বৃষ্টি হলে দিনের তাপমাত্রা কমে আসবে এবং রাতের তাপসাত্রা কিছুটা বাড়বে। এতে তাপমাত্রার উন্নতি হলেও শীতের অনুভব বাড়বে।’

তবে আগামী সপ্তাহের শুরুতে শীতের তীব্রতা আবারও বাড়তে পারে জানিয়ে এই আবহাওয়াবিদ বলেন, ‘মেঘ কেটে গেলেই শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকবে। পুরো জানুয়ারি মাসেই এই বাড়া-কমা চলবে।’ বৃষ্টির বিষয়ে আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি কেটে গেলেই তাপমাত্রা আবারও কমবে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্ত অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগ (১৩ জেলা), খুলনা বিভাগ (১০ জেলা), রাজশাহী বিভাগ (৮ জেলা), রংপুর বিভাগ (৮ জেলা) এবং মৌলভীবাজার, ভোলা, বরিশাল ও কুমিল্লা জেলার ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বইছে। অন্যদিকে ৪৪টি আবহাওয়া স্টেশনের মধ্যে ৫টি (ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, তেঁতুলিয়া ও কুড়িগ্রামের রাজারহাট) স্টেশনে মাঝারি মাত্রার এবং ২১টি স্টেশনে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে।

দিনের তাপমাত্রা কমলে ও রাতের তাপমাত্রা বাড়লে আবহাওয়ার কী পরিবর্তন হতে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা বলেন, ‘দিনের তাপমাত্রা কমে গেলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে যাবে, তখন শীত অনুভব বেড়ে যাবে। রাতে তো স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা কম থাকবে।’

তবে এবারের শীতকে কোনোভাবেই তীব্র শীত বলতে নারাজ আবহাওয়াবিদরা। তাদের মতে, তাপমাত্রার পারদ বেশি নামেনি। এখনো দেশের বিভিন্ন এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। সে হিসেবে মৃদু ও মাঝারির শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে থাকবে দেশ। জানুয়ারি এমনিতেই সবচেয়ে শীতলতম মাস। এ মাসে সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা থাকার কথা ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সাধারণত কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। চলতি মাসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেশে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাবে না বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

বিপর্যস্ত জনজীবন : হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের বেশিরভাগ এলাকার জনজীবন। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘর থেকে বের হচ্ছে না। দিন ও রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে শীতার্ত মানুষ; বিশেষ করে ছিন্নমূল ও দিনমজুররা সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন। কমেছে তাদের আয়। শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাসপাতালে বাড়ছে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভিড়। ঘন কুয়াশায় বিঘ্ন ঘটছে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে চলাচল।

সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে গতকাল তাপমাত্রার পারদ নামে ৭ ডিগ্রিতে। এটাই এই মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। জেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ শীতজনিত বিভিন্ন রোগ। আর কাজকর্ম কমে যাওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষদের দিন কাটছে অভাব-অনটনে।

ঠাকুরগাঁওয়ে আজ বুধ ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুদিন জেলার সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ঘন কুয়াশা ও শীতের দাপটে কুড়িগ্রামবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জেলার হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশিসহ শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। গত বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ রয়েছে জেলার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের দুই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

রাজশাহীতে গতকাল মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়। স্কুল খোলার ঘোষণা থাকলেও হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় সব প্রাথমিক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরা যাওয়ার পর ছুটির ঘোষণা শুনে বাড়ি ফিরে যায়। তবে মাধ্যমিক স্কুল খোলা আছে।

দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামায় গতকাল মঙ্গল ও আজ বুধবার সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে আগে থেকেই বন্ধের নির্দেশনা না জানানোয় শিক্ষার্থীরা স্কুলে এসে বাড়ি ফিরে যায়।

কুমিল্লায় শীতের দাপটে কাবু দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষজন। অন্যদিকে হাসপাতালে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। গতকাল জেলায় সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এমন তাপমাত্রায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ থাকার কথা, কিন্তু তা মানা হচ্ছে না।

তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামায় ফরিদপুরে আজ বুধ ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার জেলার মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় হাসপাতালে বেড়েছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত রোগীর সংখ্যা।

তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যাওয়ায় খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বন্ধের খবর দেরিতে পাওয়ায় গতকাল বহু শিক্ষার্থী স্কুলে গিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামায় গতকাল ও আজ বুধবার উপজেলার সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। হাড়কাঁপানো শীতে বিপাকে পড়েছেন নদীতীরবর্তী এ উপজেলার মানুষ।

নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম ও খুলনা এবং সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি