প্রায় এক মাস আগে অপহরণের শিকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান হিমেলকে সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে র্যাব। তাকে অপহরণের পর নৃশংস নির্যাতন করে মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় আন্তর্জাতিক এ অপহরণ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে তারা।
র্যাব বলছে, গ্রেপ্তারদের মধ্যে অপহরণের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছামিদুল ইসলাম ছিল অপহৃত হিমেলের পরিবারের গাড়িচালক। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্যাতন করে সেই ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করে হিমেলকে ছেড়ে দেওয়া। প্রথমে দুই কোটি, তারপর ৫০ লাখ এবং সবশেষে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করে চক্রটির প্রধান আবদুল মালেক। মুক্তিপণের টাকা না পেলে হিমেলের হাত-পা কেটে ফেলা ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
হিমেলকে উদ্ধার ও এ ঘটনায় গ্রেপ্তারদের বিষয়ে জানাতে বৃহস্পতিবার (২৫ জানুয়ারি) র্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। র্যাব জানায়, গত মঙ্গলবার র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র্যাব-১, র্যাব-৯ ও র্যাব-১৪-এর দল তাহিরপুর এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় হিমেলকে অপহরণের হোতা মো. আবদুল মালেক, তার সহযোগী ও পরিকল্পনাকারী ছামিদুল ইসলামকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে হিমেলকে তাহিরপুর সীমান্ত থেকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় রনিকে (৪১)। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে রাসেল মিয়া (৩৪) ও বিল্লাল হোসেন (২৪) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও দুটি ওয়াকিটকি।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অপহরণকারী চক্রের হোতা মো. আবদুল মালেক (৩৫)। তিনি আন্তর্জাতিক অপহরণ চক্রের অন্যতম সদস্য। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা ও মেঘালয়েও অপহরণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে দেশে ১৪টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া একই চক্রের রনি নাবাল আন্তর্জাতিক অপহরণ চক্রে যুক্ত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মেঘালয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, চার বছর ধরে হাসিবুর রহমান হিমেলের পরিবারের গাড়িচালক ছিলেন ছামিদুল। এ সময়ের মধ্যে পরিবারটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলে তাদের আর্থিক ও সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য জেনে নেন। এরপর গত বছর ১৬ ডিসেম্বর পেশাদার অপহরণকারী চক্রের হোতা মালেকের নেতৃত্বে উত্তরায় মিলিত হয়ে হিমেলকে অপহরণের পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছামিদুল শেরপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাটারি বিক্রির সম্ভাবনার কথা জানান হিমেলকে। একপর্যায়ে শেরপুরে যেতে হিমেলকে আগ্রহী করে তোলেন। এরপর ২৬ ডিসেম্বর সকালে শেরপুরের উদ্দেশে রওনা হন তারা। গাজীপুরের সালনায় এলে ছামিদুল ও হিমেলকে গাড়িসহ আটকে জিম্মি করা হয়। এরপর তাদের নেওয়া হয় ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী এলাকা ধোবাউড়ায়। সেখান থেকে রাসেল ও বিল্লাল নামে দুজন গাড়িটি নিয়ে গাজীপুরের বাসন এলাকায় রেখে আসেন। এরপর ময়মনসিংহে চলে যান বিল্লাল। আর রাসেল উত্তরাতে হিমেলের মায়ের গতিবিধি অনুসরণ করেন।
ধোবাউড়ায় তিন দিন থাকার পর বিল্লাল ছাড়া মালেক, ছামিদুল ও অপহরণ চক্রের অন্য সদস্যরা হিমেলকে নিয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় যান। এরপর রনি নামে এক ব্যক্তির সহযোগিতায় সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় হিমেলকে নিয়ে অবস্থান করেন তারা। এ সময় তারা অপহৃত হিমেলকে নির্যাতন করেন। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে কল করে প্রথমে হিমেলের মায়ের কাছে ২ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন এবং তার ছেলেকে নৃশংস কায়দায় নির্যাতনের ভিডিওচিত্র পাঠান।
এরপর অপহরণকারীরা ২৩ জানুয়ারি টাকা নিয়ে তাহিরপুরে যেতে বলে। বিষয়টি র্যাবকে জানান হিমেলের মা। সে অনুযায়ী ওইদিন হিমেলের মা নেত্রকোনায় পৌঁছলে মালেক ও ছামিদুল তাকে তাহিরপুরে যেতে বলেন। তখন র্যাবের একটি দল তাহিরপুরে তাদের গ্রেপ্তার করে। এরপর মালেক ও ছামিদুলের দেওয়া তথ্যে তাহিরপুরে পাহাড়ি টিলা এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় হিমেলকে। এ সময় অপহরণ চক্রের দুই সদস্য পালিয়ে যান।
র্যাব জানায়, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হিমেলের বাসা উত্তরায়। তার বাবা ব্যাটারির ব্যবসা করতেন। চার মাস আগে বাবা মারা গেলে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসায় নামেন হিমেল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অপহরণের দিন তিনেকের মাথায় তারা বুঝতে পারেন হিমেল আর বাংলাদেশে নেই। পুলিশ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নেত্রকোণার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে কয়েকবার অভিযানও চালায়। কিন্তু কিছুতেই অপহরণকারীদের নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় অপহরণকারীদের ছবি গ্রামের লোকজনের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দুর্গম পাহাড়ের এই পাড়ে হাওর, অন্য পাড়ে ভারতের মেঘালয়। সেখানে ঘন জঙ্গল ও পাহাড়।
অন্যদিকে ভারতের পুলিশ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। সেই ব্যক্তিই হিমেলকে অপহরণকারীদের কাছে ভারতের একটি কোম্পানির মোবাইল ফোনের সিম বিক্রি করেছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় পুলিশ অপহরণকারীদের পালিয়ে থাকার সম্ভাব্য জায়গাগুলোয় অভিযান চালায়। বেশ কয়েকটি আস্তানা থেকে ফোন নম্বর লেখা খাতা, কাগজপত্র, মোবাইল ফোন উদ্ধার করে তারা। কিন্তু অপহরণকারীরা অধরাই থেকে যায়। বাংলাদেশের পুলিশ ভারতীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। মেঘালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমে খাসি হিলস জেলার ননগ্লাম থানার পাহাড়ি এলাকায় ঢাকার পুলিশের তথ্যে অভিযান শুরু করে মেঘালয়ের পুলিশ। এ ঘটনায় ঢাকায় গোয়েন্দা বিভাগ অপহরণকারী চক্রটির দুই নারী সদস্য রুবিনা ও কামরুন্নাহারকে গ্রেপ্তার করে।